টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক বা ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণার উপস্থিতি নিয়ে আলোচনা চলছিলই। এবার নিত্যদিনের খাদ্যতালিকায় থাকা দুধ, চিনি ও সয়াবিন তেলেও উল্লেখযোগ্য মাত্রায় মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়ার গবেষণা তথ্য নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। প্রতিদিনের খাবারের সঙ্গে অজান্তেই কতটা ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা মানুষের শরীরে প্রবেশ করছে এবং দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব কী হতে পারে—এ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে জনমনে।

গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, বিশেষ করে সয়াবিন তেলের মাধ্যমে একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ প্রতিদিন গড়ে ১৭ দশমিক ৬৫টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা গ্রহণ করতে পারেন। বছরে এর পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৬ হাজার ৪৪১টি কণা। শিশুদের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য গ্রহণের মাত্রা আরও বেশি। গবেষকদের হিসাবে, একজন শিশু প্রতিদিন গড়ে ৭৭ দশমিক ২১টি, অর্থাৎ বছরে প্রায় ২৮ হাজার ১৮০টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণার সংস্পর্শে আসতে পারে।

খাবারে কীভাবে ঢুকছে মাইক্রোপ্লাস্টিক?

গবেষকদের মতে, খাদ্যপণ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিক প্রবেশের অন্যতম কারণ হলো প্লাস্টিকের বোতল, প্যাকেট ও বস্তা। দীর্ঘদিন সংরক্ষণ, পরিবহন কিংবা ব্যবহারের সময় এসব প্লাস্টিক সামগ্রী থেকে ক্ষুদ্র কণা আলাদা হয়ে খাদ্যের সঙ্গে মিশে যেতে পারে।

শুধু প্যাকেট বা বোতলই নয়, খাদ্য উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণের সময়ও মাইক্রোপ্লাস্টিক তৈরি হতে পারে। কারখানার মেশিন, পাইপ, কনভেয়ার বেল্ট ও অন্যান্য প্লাস্টিক বা পলিমারজাত উপকরণের ক্ষয় থেকে ক্ষুদ্র কণা উৎপন্ন হয়ে খাদ্যে মিশে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

আরেকটি বড় উৎস হলো পরিবেশ। প্লাস্টিক বর্জ্য দীর্ঘদিন পরিবেশে পড়ে থেকে সূর্যের আলো, তাপ, বৃষ্টি ও ঘর্ষণের প্রভাবে ধীরে ধীরে ক্ষুদ্র কণায় পরিণত হয়। এসব কণা পানি, মাটি ও বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করতে পারে।

বাংলাদেশে প্লাস্টিক বর্জ্যও বড় উদ্বেগ

বাংলাদেশে বিপুল পরিমাণ প্লাস্টিক বর্জ্য তৈরি হচ্ছে। গবেষকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতিদিন প্রায় ৮ হাজার টন প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপন্ন হয়। এর অর্ধেকেরও বেশি সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনার বাইরে থেকে যায়। ফলে এসব বর্জ্য পরিবেশে জমে থেকে ধীরে ধীরে ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণায় পরিণত হওয়ার সুযোগ তৈরি করছে।

বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, প্লাস্টিক বর্জ্য যথাযথভাবে সংগ্রহ, পুনর্ব্যবহার ও নিষ্পত্তি করা না গেলে ভবিষ্যতে মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ আরও বাড়তে পারে। এর প্রভাব শুধু খাদ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; পানি, মাটি ও বাতাসের মাধ্যমেও মানুষের শরীরে এসব কণা প্রবেশ করতে পারে।

শরীরে গেলে কী ক্ষতি হতে পারে?

মাইক্রোপ্লাস্টিক মানবদেহে প্রবেশের পর এর সম্ভাব্য স্বাস্থ্যপ্রভাব নিয়ে বিশ্বজুড়ে গবেষণা চলছে। বিভিন্ন গবেষণায় শরীরের প্রদাহ, অক্সিডেটিভ স্ট্রেস, রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার ওপর প্রভাব এবং কোষীয় পর্যায়ের ক্ষতির সম্ভাবনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। কিছু গবেষণায় হরমোন ও প্রজননস্বাস্থ্যের ওপর সম্ভাব্য প্রভাবের বিষয়টিও আলোচিত হয়েছে।

তবে বিজ্ঞানীরা এখনো বলছেন, মানুষের শরীরে খাদ্যের মাধ্যমে প্রবেশ করা মাইক্রোপ্লাস্টিকের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে আরও গবেষণা প্রয়োজন। তাই আতঙ্ক নয়, বরং সতর্কতা ও দূষণ কমানোর উদ্যোগই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

শিশুদের নিয়ে বিশেষ উদ্বেগ

মাইক্রোপ্লাস্টিক গ্রহণের ক্ষেত্রে শিশুদের সম্ভাব্য ঝুঁকি বিশেষভাবে গুরুত্ব পাচ্ছে। গবেষকদের হিসাবে শিশুদের ক্ষেত্রে দৈনিক গ্রহণের পরিমাণ প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় অনেক বেশি হতে পারে।

শিশুরা বিভিন্ন প্যাকেটজাত খাবার, পানীয় ও প্লাস্টিকের পাত্র ব্যবহারের মাধ্যমে মাইক্রোপ্লাস্টিকের সংস্পর্শে আসতে পারে। তাই শিশুদের খাবার ও পানীয় সংরক্ষণে প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো এবং নিরাপদ বিকল্প ব্যবহারে গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।

প্রতিকার কী?

মাইক্রোপ্লাস্টিক পুরোপুরি এড়িয়ে চলা বর্তমানে কঠিন। তবে কিছু অভ্যাস পরিবর্তনের মাধ্যমে এর সংস্পর্শ কমানো সম্ভব।

প্লাস্টিকের বোতল ও পাত্রের পরিবর্তে কাচ, স্টিল বা অন্যান্য নিরাপদ বিকল্প ব্যবহার করা যেতে পারে। বিশেষ করে গরম খাবার বা পানীয় দীর্ঘ সময় প্লাস্টিকের পাত্রে রাখা থেকে বিরত থাকা ভালো।

প্যাকেটজাত খাবার ব্যবহারের ক্ষেত্রেও সচেতন হওয়া প্রয়োজন। সম্ভব হলে তাজা ও কম প্রক্রিয়াজাত খাবার বেছে নেওয়া, খাবার সংরক্ষণে প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো এবং খাদ্যপণ্যের প্যাকেজিং ও সংরক্ষণব্যবস্থা উন্নত করা জরুরি।

তবে ব্যক্তিগত সচেতনতার পাশাপাশি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা। উৎপাদন, পরিবহন ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণে মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণের সম্ভাব্য উৎসগুলো চিহ্নিত করে কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে হবে।

প্রয়োজন নিয়মিত পরীক্ষা ও নজরদারি

বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে খাদ্যপণ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি নিয়ে আরও বিস্তৃত গবেষণা প্রয়োজন। দুধ, তেল, চিনি ছাড়াও মাছ, চাল, লবণ, পানি, সবজি, মসলা ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিকের মাত্রা নিয়মিত পরীক্ষা করা দরকার।

একই সঙ্গে খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্যাকেজিং উপকরণ, উৎপাদনযন্ত্র ও প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থার ওপর নজরদারি বাড়াতে হবে।

মাইক্রোপ্লাস্টিক এখন আর শুধু পরিবেশ দূষণের বিষয় নয়—এটি খাদ্যনিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্যের সঙ্গেও জড়িয়ে পড়ছে। তাই আতঙ্ক ছড়ানোর পরিবর্তে বৈজ্ঞানিক গবেষণা, নিয়মিত খাদ্য পরীক্ষা, নিরাপদ প্যাকেজিং এবং কার্যকর প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এই ঝুঁকি মোকাবিলায় এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।