সবার সঙ্গে সমতা ও শ্রদ্ধার ভিত্তিতে বন্ধুত্ব চায় বাংলাদেশ: প্রধানমন্ত্রী
নিজস্ব প্রতিবেদক
জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব ও আত্মমর্যাদা রক্ষাকে আগামীর বাংলাদেশের মূল অঙ্গীকার হিসেবে উল্লেখ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশ পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সমতার ভিত্তিতে বিশ্বের সব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব ও সহযোগিতা সুদৃঢ় করতে চায়।
রোববার কয়েকটি ব্যাটালিয়ন ও রেজিমেন্টকে জাতীয় পতাকা বা ন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড প্রদান উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
জাতীয় পতাকা একটি ইউনিটের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের প্রতীক
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, একজন সেনা পরিবারের সদস্য হিসেবে তিনি সেনা পরিবেশেই বেড়ে উঠেছেন। ফলে আজকের অনুষ্ঠানে ভিন্ন পরিচয়ে উপস্থিত হলেও এ ধরনের পরিবেশ তাঁর কাছে নতুন নয়।
তিনি জানান, পেশাগত সাফল্যের স্বীকৃতিস্বরূপ ৭ ও ৩২ ফিল্ড রেজিমেন্ট আর্টিলারি, ২৫ এয়ার ডিফেন্স রেজিমেন্ট, ৯ ইঞ্জিনিয়ার ব্যাটালিয়ন, ৫৬ ও ৫৭ ইস্ট বেঙ্গল এবং প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্ট জাতীয় পতাকা প্রাপ্তির গৌরব অর্জন করেছে। এ অর্জনের জন্য সংশ্লিষ্ট ইউনিটগুলোর সদস্যদের অভিনন্দন জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড কেবল একটি পতাকা নয়; এটি একটি ইউনিটের ইতিহাস, ঐতিহ্য, শৃঙ্খলা, আত্মত্যাগ, পেশাদারিত্ব এবং দেশের প্রতি অঙ্গীকারের প্রতীক। জাতীয় পতাকার গৌরবময় উড্ডয়ন স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং অসংখ্য মানুষের আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
তিনি আরও বলেন, জাতীয় পতাকা অর্জনের অর্থ হলো অর্পিত দায়িত্ব আরও নিষ্ঠার সঙ্গে পালনের নতুন শপথ। পতাকার মর্যাদা রক্ষা করা প্রত্যেক সৈনিকের পবিত্র দায়িত্ব।
মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সেনাবাহিনীর জন্ম ইতিহাস জড়িত
বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিভিন্ন সময়ে সশস্ত্র বাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার অপচেষ্টা হয়েছে। তবে বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর জন্ম যে স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে, তা স্মরণ রাখা জরুরি।
তিনি ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি বাহিনীর হামলার পর চট্টগ্রামে অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের তৎকালীন উপঅধিনায়ক মেজর জিয়াউর রহমানের ভূমিকার কথা উল্লেখ করেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ‘উই রিভোল্ট’ ঘোষণা দেওয়ার পর জিয়াউর রহমান রেজিমেন্টে ফিরে বাংলাভাষী কর্মকর্তা ও সৈনিকদের একত্র করেন এবং সশস্ত্র সংগ্রামে অংশ নেওয়ার নির্দেশ দেন।
প্রধানমন্ত্রী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের লেখা ‘একটি জাতির জন্ম’ নিবন্ধের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। নিবন্ধে জিয়াউর রহমানের বর্ণনা অনুযায়ী, ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ রাত ২টা ১৫ মিনিটে তিনি ব্যাটালিয়নের কর্মকর্তা, জেসিও ও সৈনিকদের উদ্দেশে বক্তব্য দেন এবং তাঁদের সশস্ত্র সংগ্রামে অবতীর্ণ হওয়ার নির্দেশনা দেন।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ২৭ মার্চ জিয়াউর রহমান কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে পুনরায় স্বাধীনতার ঘোষণা দেন, যা দেশে-বিদেশে ছড়িয়ে পড়ে। তাঁর মতে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধে একজন সেনা কর্মকর্তার এই ভূমিকা সশস্ত্র বাহিনীর জন্য অনুপ্রেরণাদায়ক অধ্যায়।
তিনি উল্লেখ করেন, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে গণহত্যার বিরুদ্ধে প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ ও অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বাংলাভাষী সেনাসদস্যরা পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন।
আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব
প্রধানমন্ত্রী বলেন, একটি আধুনিক সশস্ত্র বাহিনীর শক্তি শুধু অস্ত্র, সরঞ্জাম কিংবা জনবলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর প্রকৃত শক্তি নিহিত থাকে শৃঙ্খলা, দক্ষতা, নেতৃত্ব, নৈতিকতা, প্রশিক্ষণ এবং জনগণের আস্থার মধ্যে। এ ক্ষেত্রে চেইন অব কমান্ডও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, সশস্ত্র বাহিনীকে আরও প্রযুক্তিনির্ভর, দক্ষ, শৃঙ্খলাবদ্ধ, পেশাদার ও আধুনিক করে গড়ে তোলার কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সশস্ত্র বাহিনীর সব পর্যায়ের কর্মকর্তা ও সৈনিক সংবিধান, আইন, সামরিক বিধিবিধান এবং মানবিক মূল্যবোধের প্রতি অবিচল থাকবেন—এটাই জনগণের প্রত্যাশা।
তারেক রহমান বলেন, বিশ্বের নিরাপত্তা পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। যুদ্ধের ধরন ও কৌশলেও পরিবর্তন আসছে। স্থল, সমুদ্র ও আকাশের পাশাপাশি সাইবার স্পেস, মহাকাশ, ড্রোন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ এবং তথ্যভিত্তিক সক্ষমতা জাতীয় নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
এ বাস্তবতায় প্রতিরক্ষা প্রস্তুতিকে সময়োপযোগী করে এগিয়ে নেওয়ার কাজ চলছে বলে জানান তিনি। একই সঙ্গে সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়নের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় অস্ত্র, গোলাবারুদ ও প্রতিরক্ষাসামগ্রী দেশেই উৎপাদনের লক্ষ্যে দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্প প্রতিষ্ঠার ওপর সরকারের গুরুত্বারোপের কথা তুলে ধরেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রযুক্তি কখনোই মানুষের বিকল্প নয়। তাই প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর মধ্যে সমন্বিতভাবে কাজ করার সক্ষমতা গড়ে তোলা প্রয়োজন।
দুর্যোগ মোকাবিলা ও শান্তিরক্ষা মিশনে সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকা
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সশস্ত্র বাহিনী শুধু দেশের প্রতিরক্ষার দায়িত্ব পালন করে না; দুর্যোগ, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, অগ্নিকাণ্ড এবং অন্যান্য জাতীয় জরুরি পরিস্থিতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পাশাপাশি বিদেশে শান্তিরক্ষা মিশনেও বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন।
তিনি জানান, সেনাসদস্যদের কল্যাণ, আবাসন, চিকিৎসা, শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, পেশাগত উন্নয়ন এবং অবসর-পরবর্তী সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়গুলো সরকার গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, জাতীয় পে-স্কেলে সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের বেতন ও ভাতা ১০০ শতাংশ থেকে ১৩৮ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। এ ছাড়া সেনাসদস্যদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের লক্ষ্যে ‘ওয়ান র্যাংক ওয়ান পেনশন’ বাস্তবায়নের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় অঙ্গীকার
বক্তব্যের শেষাংশে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব ও আত্মমর্যাদা রক্ষার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ সব দেশের সঙ্গে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সমতার ভিত্তিতে বন্ধুত্ব এবং সহযোগিতা জোরদার করতে আগ্রহী। জাতীয় স্বার্থ অক্ষুণ্ন রেখে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক উন্নয়নই হবে আগামীর বাংলাদেশের অন্যতম লক্ষ্য।

