বাংলাদেশে ৩৫ বছর পেরোলেই কেন আইনজীবী হওয়ার পথে বাধা?
আইনজীবী হতে সর্বোচ্চ বয়সসীমা কত? বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নিয়ম কী?
গণদিগন্ত | বিশেষ প্রতিবেদন
নিজস্ব প্রতিবেদক
আইন পেশায় প্রবেশের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ বয়সসীমা থাকা উচিত কি না, তা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে আলোচনা হয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশে পেশা পরিবর্তনকারী, অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি এবং উচ্চশিক্ষা শেষে আইন পেশায় আসতে আগ্রহীদের জন্য বয়সসীমার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। তবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আইনজীবী হওয়ার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ বয়সসীমা নির্ধারণের পরিবর্তে শিক্ষাগত যোগ্যতা, পেশাগত প্রশিক্ষণ, লাইসেন্স ও নিবন্ধনের শর্তকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।
যুক্তরাজ্যে আইনজীবী হওয়ার সর্বোচ্চ বয়সসীমা নেই
আইন পেশার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র যুক্তরাজ্যে আইনজীবী হওয়ার জন্য সাধারণভাবে কোনো সর্বোচ্চ বয়সসীমা নির্ধারিত নেই। সেখানে সলিসিটর কিংবা ব্যারিস্টার হতে নির্ধারিত শিক্ষাগত ও পেশাগত যোগ্যতা অর্জন করতে হয়। সলিসিটর হওয়ার ক্ষেত্রে সলিসিটরস কোয়ালিফাইং এক্সামিনেশন (এসকিউই) এবং অন্যান্য নির্ধারিত শর্ত পূরণ করতে হয়।
অর্থাৎ, কেউ তুলনামূলক বেশি বয়সে আইন পেশায় প্রবেশ করতে চাইলে তাঁর জন্য বয়সের চেয়ে প্রয়োজনীয় যোগ্যতা অর্জন ও পেশাগত শর্ত পূরণ করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ভারতে বয়সসীমা নিয়ে আইনি বিতর্ক
বাংলাদেশের প্রতিবেশী দেশ ভারতে আইন পেশায় প্রবেশের সর্বোচ্চ বয়সসীমা নিয়ে অতীতে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। বার কাউন্সিলের পক্ষ থেকে আইনজীবী হিসেবে নিবন্ধনের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৪৫ বছর বয়সসীমা নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এ ধরনের বয়সসীমা নিয়ে আইনি চ্যালেঞ্জ ও আদালতের পর্যবেক্ষণের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট রায়, মামলার বিবরণ এবং বর্তমানে কার্যকর বিধি যাচাই করে সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছানো প্রয়োজন। তাই ভারতের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ বয়সসীমা নেই—এমন চূড়ান্ত বক্তব্য দেওয়ার আগে হালনাগাদ আইন ও আদালতের সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা করা জরুরি।
পাকিস্তানে আইন পেশায় প্রবেশের শর্ত
পাকিস্তানে আইনজীবী হিসেবে কাজ করতে হলে সংশ্লিষ্ট আইন, শিক্ষাগত যোগ্যতা, পেশাগত পরীক্ষা এবং বার কাউন্সিলের নিবন্ধনসংক্রান্ত শর্ত পূরণ করতে হয়। তবে আইনজীবী হওয়ার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ বয়সসীমা নেই—এমন দাবি করার আগে সংশ্লিষ্ট বার কাউন্সিলের বর্তমান বিধিমালা যাচাই করা প্রয়োজন।
ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে কী নিয়ম?
ইউরোপের বিভিন্ন দেশে আইন পেশায় প্রবেশের নিয়ম এক নয়। দেশভেদে শিক্ষাগত যোগ্যতা, পেশাগত প্রশিক্ষণ, পরীক্ষা এবং নিবন্ধনের শর্ত আলাদা হতে পারে। তবে আইনজীবী হওয়ার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ বয়সসীমা আছে কি না, তা নির্দিষ্ট দেশ ও সংশ্লিষ্ট পেশাগত নিয়ন্ত্রক সংস্থার বিধি অনুযায়ী নির্ধারণ করতে হয়।
যুক্তরাষ্ট্রেও আইন পেশায় প্রবেশের নিয়ম অঙ্গরাজ্যভেদে ভিন্ন। সাধারণত আইন বিষয়ে নির্ধারিত শিক্ষাগত যোগ্যতা, বার পরীক্ষা এবং অন্যান্য লাইসেন্সিং শর্ত পূরণ করতে হয়। তাই সব অঙ্গরাজ্যের জন্য একই নিয়ম প্রযোজ্য—এমন ধারণা সঠিক নয়।
বাংলাদেশে বয়সসীমা নিয়ে প্রশ্ন
বাংলাদেশে আইনজীবী হিসেবে পেশাগত জীবন শুরু করতে আগ্রহীদের জন্য বয়সসীমার প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে অন্য পেশায় দীর্ঘদিন কাজ করার পর আইন পেশায় আসতে চান, এমন ব্যক্তি কিংবা অবসরপ্রাপ্তদের জন্য বিষয়টি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।
বাংলাদেশে আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের নির্ধারিত শিক্ষাগত যোগ্যতা, পরীক্ষা, প্রশিক্ষণ এবং অন্যান্য প্রযোজ্য শর্ত পূরণ করতে হয়। সর্বোচ্চ বয়সসীমা সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে বার কাউন্সিলের সর্বশেষ বিধিমালা ও প্রযোজ্য আদালতের রায় যাচাই করা প্রয়োজন।
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শাহদীন মালিকের বক্তব্যের বরাতে মূল লেখায় উল্লেখ করা হয়েছে, উন্নত বিশ্বে পেশাগত জীবনে প্রবেশের ক্ষেত্রে বয়সের চেয়ে যোগ্যতার বিষয়টি বেশি গুরুত্ব পায়। তবে বিভিন্ন দেশে চাকরিতে প্রবেশ, অবসর এবং আইন পেশায় নিবন্ধনের নিয়ম এক নয়।
বয়স নয়, যোগ্যতাই হোক প্রধান বিবেচ্য
আইন পেশা এমন একটি ক্ষেত্র, যেখানে অভিজ্ঞতা, যুক্তিবোধ, আইনি জ্ঞান, বিশ্লেষণী ক্ষমতা ও নৈতিকতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেউ জীবনের পরবর্তী পর্যায়ে আইন বিষয়ে পড়াশোনা করে পেশাগত যোগ্যতা অর্জন করতে চাইলে তাঁর জন্য সুযোগ কতটা উন্মুক্ত থাকবে, তা নীতিনির্ধারণের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
বয়সসীমা আরোপের পক্ষে যুক্তি থাকতে পারে, আবার এর বিপরীতে পেশা নির্বাচনের স্বাধীনতা ও বৈষম্যহীন সুযোগের প্রশ্নও রয়েছে। এ কারণে আইনজীবী হওয়ার সর্বোচ্চ বয়সসীমা নির্ধারণের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হলে দেশের আইন, সাংবিধানিক অধিকার এবং পেশাগত মান বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় নেওয়া উচিত।
সারকথা: বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আইনজীবী হওয়ার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ বয়সসীমা সম্পর্কে একক কোনো আন্তর্জাতিক নিয়ম নেই। দেশভেদে বিধি ভিন্ন হওয়ায় বাংলাদেশসহ প্রতিটি দেশের বর্তমান আইন ও পেশাগত নিয়ন্ত্রক সংস্থার নিয়ম যাচাই করেই সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব।

