আবরার হত্যার ৭ বছর: রায় কার্যকরের অপেক্ষায় হতাশ পরিবার
গণদিগন্ত প্রতিবেদক, কুষ্টিয়া
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) মেধাবী শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যার সাত বছর পূর্ণ হলো আজ। বহুল আলোচিত এ হত্যা মামলায় নিম্ন আদালতের দেওয়া ২০ আসামির মৃত্যুদণ্ড ও পাঁচজনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের রায় পরবর্তী সময়ে হাইকোর্টেও বহাল রয়েছে। তবে মামলার চূড়ান্ত বিচারিক প্রক্রিয়া এখনো শেষ না হওয়ায় সাজা কার্যকর নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি। এতে দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষায় থাকা আবরারের পরিবারে তৈরি হয়েছে হতাশা ও ক্ষোভ।
২০১৯ সালের ৬ অক্টোবর রাতে বুয়েটের শেরেবাংলা হলের একটি কক্ষে নির্যাতনের শিকার হয়ে প্রাণ হারান তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ। এর আগে ভারতের সঙ্গে পানি বণ্টনসহ বিভিন্ন বিষয়ে করা চুক্তি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পোস্ট দেওয়াকে কেন্দ্র করে তাকে হলে ডেকে নেওয়া হয়েছিল বলে মামলার নথিতে উঠে আসে।
ঘটনার পরদিন হলের সিঁড়ি থেকে আবরারের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ হত্যাকাণ্ড দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্ররাজনীতি, আবাসিক হলে নির্যাতন এবং রাজনৈতিক প্রভাবের বিষয়গুলোও নতুন করে আলোচনায় আসে।
বিচার এগোলেও শেষ হয়নি প্রক্রিয়া
আবরারের বাবা মো. বরকত উল্লাহ বাদী হয়ে চকবাজার থানায় হত্যা মামলা করেন। তদন্ত শেষে পুলিশ ২০১৯ সালের ১৩ নভেম্বর বুয়েটের ২৫ শিক্ষার্থীকে আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র দেয়।
দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে ২০২১ সালের ৮ ডিসেম্বর ঢাকার আদালত মামলার ২০ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড এবং পাঁচজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। পরে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের ডেথ রেফারেন্স এবং আসামিদের আপিলের শুনানি হয় হাইকোর্টে।
২০২৫ সালের ১৬ মার্চ হাইকোর্ট নিম্ন আদালতের দেওয়া সাজা বহাল রাখেন। তবে হাইকোর্টের রায়ের পর কয়েকজন আসামি আপিল বিভাগে আবেদন করায় মামলাটির চূড়ান্ত বিচারিক ধাপ এখনো সম্পন্ন হয়নি। ফলে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের জন্য আরও আইনি প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার অপেক্ষা রয়েছে।
‘অপেক্ষা ছাড়া আর কিছু করার নেই’
আবরারের ছোট ভাই আবরার ফাইয়াজ বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে পরিবার বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ করলেও কার্যকর অগ্রগতি দেখতে পাচ্ছেন না তারা। তার ভাষ্য অনুযায়ী, মামলাটি আদালতের সিরিয়াল অনুযায়ী এগোনোর কথা বলা হচ্ছে।
তিনি বলেন, প্রয়োজনীয় জায়গাগুলোতে যোগাযোগ করেও এখন তাদের মূলত অপেক্ষা করতে হচ্ছে। রায় কার্যকরে কোথায় জটিলতা রয়েছে, সেটিও পরিবারের কাছে স্পষ্ট নয়। বিষয়টি তাদের কাছে এক ধরনের অবহেলা বলেই মনে হচ্ছে বলে জানান তিনি।
ফাইয়াজের দাবি, আবরার হত্যাকাণ্ড শুধু একটি পরিবারের জন্য শোকের ঘটনা ছিল না; এটি দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতাতেও বড় ধরনের প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল। তার মতে, সেই হত্যাকাণ্ডের বিচার দ্রুত সম্পন্ন হওয়া জরুরি।
বাবার ক্ষোভ
আবরারের বাবা মো. বরকত উল্লাহ বলেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মামলাটির গুরুত্ব যেন কমে গেছে। একের পর এক আদালতের রায় এলেও চূড়ান্তভাবে সাজা কার্যকর না হওয়ায় তিনি হতাশ।
তিনি মনে করেন, আবরারের হত্যার বিচার ও রায় কার্যকর শুধু তার পরিবারের প্রত্যাশা নয়; দেশের মানুষেরও এ বিষয়ে আগ্রহ রয়েছে। দ্রুত আইনি প্রক্রিয়া শেষ করে রায় কার্যকরের উদ্যোগ নেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
কুষ্টিয়ায় স্মরণ ও দোয়া
আবরার ফাহাদের সপ্তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে তার নিজ এলাকা কুষ্টিয়ার কয়া ইউনিয়নের রায়ডাঙ্গা গ্রামে আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে। স্থানীয়দের পক্ষ থেকেও আবরার হত্যা মামলার রায় দ্রুত কার্যকর করার দাবি জানানো হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ার পর যখন নিম্ন আদালত ও হাইকোর্টে সাজা বহাল রয়েছে, তখন মামলার অবশিষ্ট আইনি ধাপ দ্রুত সম্পন্ন করা প্রয়োজন। পরিবারের দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে তারা চূড়ান্ত বিচার দেখতে চান।
আবরার হত্যার সাত বছর পরও তার পরিবারের অপেক্ষা শেষ হয়নি। আদালতের রায় ও আইনি প্রক্রিয়ার পরবর্তী ধাপ শেষ করে কবে সাজা কার্যকর হবে—এ প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে পরিবার ও স্থানীয় মানুষের মধ্যে।

