আওয়ামী লীগের সঙ্গে পুনর্মিলনের সুযোগ নেই, বিচার নিশ্চিত করতে হবে: ডেপুটি স্পিকার
গণদিগন্ত ডেস্ক:
আওয়ামী লীগের সঙ্গে রাজনৈতিক পুনর্মিলনের কোনো সুযোগ নেই বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। তাঁর ভাষ্য, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রশ্ন আলাদা হলেও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও ক্ষমতার কাঠামো ব্যবহার করে জনগণের ওপর সহিংসতা চালানোর অভিযোগে জড়িত ব্যক্তিদের অবশ্যই আইনের আওতায় এনে বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
সোমবার (৫ অক্টোবর) রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত তিন দিনব্যাপী ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন ২০২৬’-এর সমাপনী অধিবেশনে বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি এসব কথা বলেন।
কায়সার কামাল বলেন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও দলীয় কাঠামো ব্যবহার করে সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে সহিংসতা চালানোর সঙ্গে যারা জড়িত ছিলেন, তাদের বিচারের মুখোমুখি করা প্রয়োজন। তাঁর মতে, এই বিচার কেবল শাস্তি দেওয়ার উদ্দেশ্যে নয়; বরং ভবিষ্যতে যাতে কোনো রাজনৈতিক শক্তি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করে কর্তৃত্ববাদী শাসন প্রতিষ্ঠার সাহস না পায়, সে জন্যও এটি গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, দেশের বাইরে অবস্থানরত অভিযুক্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও বিচারপ্রক্রিয়া থেকে অব্যাহতির সুযোগ থাকা উচিত নয়। রাজনৈতিক পুনর্মিলন বা সমঝোতার নামে দায়মুক্তির পথ তৈরি হলে ভবিষ্যতে একই ধরনের পরিস্থিতি ফিরে আসার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
ডেপুটি স্পিকার আরও বলেন, গত দেড় দশকে দেশের বিচারব্যবস্থা রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাবের মধ্যে ছিল। বর্তমানে জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে সরকার দায়িত্ব পালন করছে এবং বিচারব্যবস্থাকে ধীরে ধীরে স্বাধীন ও কার্যকর করার প্রক্রিয়া চলছে। ভবিষ্যতে আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে একটি শক্তিশালী বিচারব্যবস্থা গড়ে উঠবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
গণতন্ত্রকে টেকসই করার জন্য স্বাধীন ও শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন কায়সার কামাল। তাঁর মতে, সরকারের প্রতি জনগণের আস্থা নির্ভর করে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, আইনের শাসন এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার যথাযথ ব্যবহারের ওপর। একই সঙ্গে বিচারব্যবস্থাকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
তিনি বলেন, রাষ্ট্রীয় সহিংসতার সঙ্গে জড়িতদের রাজনৈতিক বা অন্য কোনো পরিচয়ের আড়ালে দায়মুক্তি দেওয়ার চেষ্টা করলে জাতীয় পুনর্মিলনের উদ্যোগও প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। এ কারণে দেশের বিচারিক ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে নতুন করে শক্তিশালী করার পাশাপাশি এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমের বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়ন প্রয়োজন।
৫ আগস্টকে ঘিরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রসঙ্গ তুলে ধরে ডেপুটি স্পিকার বলেন, এটি শুধু একটি সরকার পরিবর্তনের ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; বরং এর মধ্য দিয়ে দেশের রাজনৈতিক কাঠামো ও রাষ্ট্র পরিচালনার পদ্ধতি নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজন তৈরি হয়েছে। তাঁর দাবি, নাগরিকরা আইনের শাসন, নাগরিক স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে আন্দোলন করেছে।
কায়সার কামালের ভাষ্য, ক্ষমতাচ্যুত শাসনব্যবস্থার সঙ্গে রাজনৈতিক সমঝোতার সুযোগ নেই। জনগণের নিরাপত্তা ও অধিকার রক্ষার জন্য প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রযন্ত্র যারা জনগণের বিরুদ্ধেই ব্যবহার করেছে, তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, বিশ্বজুড়ে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের অবক্ষয় ঠেকাতে এমন প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন, যেগুলো ক্ষমতাসীনদের স্বেচ্ছাচারিতা নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম। বাংলাদেশেও বর্তমানে জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থার নতুন ভিত্তি তৈরির কাজ চলছে। ভবিষ্যতে সরকার যেন কাঠামোগতভাবে জবাবদিহির বাইরে যেতে না পারে, সে লক্ষ্যেই প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
এক প্রশ্নের জবাবে ডেপুটি স্পিকার বলেন, বাংলাদেশে একসময় বিচারহীনতার সংস্কৃতি বিদ্যমান ছিল। বর্তমান সরকার জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে দায়িত্ব পালন করছে এবং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার মাধ্যমে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় কাজ করছে। জুলাই-আগস্টের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদেরও বিচারের আওতায় আনার কথা পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।
অনুষ্ঠানের ওই অধিবেশনে আরও উপস্থিত ছিলেন ভারতের ইউনিভার্সিটি অব রাজস্থানের সাউথ এশিয়া স্টাডিজ সেন্টারের অধ্যাপক করোরি সিং, নিউ এজ সম্পাদক নুরুল কবীর, দক্ষিণ আফ্রিকার উইটস ইউনিভার্সিটির গবেষক মাদালিতসো জিলিলো ফিরি এবং কলম্বিয়ার সেন্টার ফর পিস অ্যান্ড কনফ্লিক্ট স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক নিকি সিঙ্গার।
৩ থেকে ৫ অক্টোবর ঢাকায় অনুষ্ঠিত ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন ২০২৬’-এর সমাপনী দিনের আলোচনায় বাংলাদেশের গণতন্ত্র, বিচারব্যবস্থা, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে আসে।

