ছয় গম্বুজ, কালো পাথর আর বিশাল দিঘি—নওগাঁর কুসুম্বা মসজিদের গল্প
ডা. সিদ্দিকুর রহমান প্রামানিক
ছয়টি গম্বুজের নিচে নীরব প্রার্থনা। দেয়ালজুড়ে কালো পাথরের আবরণ। সেই পাথরেই সূক্ষ্ম নকশা, মেহরাবে ফুল-লতাপাতা ও ঝুলন্ত শিকলের কারুকাজ। আর মসজিদের ঠিক সামনে বিস্তৃত বিশাল দিঘি। সব মিলিয়ে যেন কয়েক শতাব্দীর পুরনো একটি ইতিহাসের পাতা চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে ওঠে।
নওগাঁর মান্দা উপজেলার কুসুম্বা গ্রামের এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটিই কুসুম্বা শাহী মসজিদ। প্রায় সাড়ে চার শতকেরও বেশি সময় ধরে দাঁড়িয়ে থাকা এ মসজিদ শুধু মুসলমানদের ইবাদতের স্থান নয়, বাংলার মধ্যযুগীয় স্থাপত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। বর্তমানে এটি বাংলাদেশ সরকারের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সংরক্ষিত পুরাকীর্তি।
আফগান শাসনের শেষ পর্বে নির্মাণ
কুসুম্বা মসজিদের ইতিহাস যুক্ত হয়ে আছে বাংলায় আফগান শাসনের শেষদিকের সময়ের সঙ্গে। মসজিদের পূর্বদিকের কেন্দ্রীয় প্রবেশপথের ওপর স্থাপিত আরবি শিলালিপিতে ৯৬৬ হিজরি, অর্থাৎ ১৫৫৮-৫৯ খ্রিস্টাব্দের নির্মাণকাল উল্লেখ রয়েছে। শিলালিপি অনুযায়ী, সুলায়মান নামের এক ব্যক্তি মসজিদটি নির্মাণ করেন। তখন বাংলায় শূর বংশের শাসক গিয়াসউদ্দীন বাহাদুর শাহ ক্ষমতায় ছিলেন।
অর্থাৎ মসজিদটির ইতিহাস প্রায় ৪৭০ বছরেরও বেশি পুরনো। এ দীর্ঘ সময়ের মধ্যেও এর মূল স্থাপত্যের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যগুলো টিকে আছে।
ইটের কাঠামো, বাইরে-ভেতরে পাথরের আবরণ
দূর থেকে কুসুম্বা মসজিদকে দেখলে মনে হতে পারে এটি পুরোপুরি পাথরের তৈরি। কিন্তু স্থাপত্যের ভেতরের কাঠামো মূলত ইটের। এর বাইরের দেয়ালের সম্পূর্ণ অংশ এবং অভ্যন্তরের নির্দিষ্ট অংশ পাথর দিয়ে আবৃত করা হয়েছে। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, মসজিদটির আয়তন প্রায় ৫৮ ফুট × ৫২ ফুট এবং দেয়াল প্রায় ৬ ফুট পুরু।
মসজিদটি আয়তাকার পরিকল্পনায় নির্মিত। ভেতরের বিন্যাসে রয়েছে তিনটি বে ও দুটি আইল। পূর্ব দিকে তিনটি প্রবেশপথ এবং উত্তর ও দক্ষিণ দিকে একটি করে প্রবেশপথ রয়েছে। চার কোণে রয়েছে অষ্টকোণাকৃতির বুরুজ বা কর্নার টাওয়ার।
এই স্থাপত্যরীতিতে বাংলার নিজস্ব নির্মাণশৈলীর প্রভাব স্পষ্ট। বাংলাপিডিয়ার বর্ণনা অনুযায়ী, শূর আমলে নির্মিত হলেও কুসুম্বা মসজিদ উত্তর ভারতের আগের শূর স্থাপত্যের অনুকরণে তৈরি হয়নি; বরং এর নকশা ও নির্মাণে বাংলার স্থাপত্যধারাই প্রধান।
ছয় গম্বুজে আলাদা বৈশিষ্ট্য
মসজিদের ছাদে রয়েছে ছয়টি গম্বুজ। দুটি প্রশস্ত স্তম্ভ এবং চারপাশের দেয়ালের ওপর গম্বুজগুলোর কাঠামো দাঁড়িয়ে আছে। আয়তাকার ছয়-গম্বুজবিশিষ্ট এই বিন্যাস কুসুম্বা মসজিদকে বাংলার সুলতানি আমলের স্থাপত্যের একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণে পরিণত করেছে।
গম্বুজের পাশাপাশি এর বাঁকানো কার্নিশ এবং অষ্টকোণাকৃতির কোণার বুরুজও বাংলার ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্যরীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
মেহরাবে পাথরের কারুকাজ
কুসুম্বা মসজিদের অন্যতম আকর্ষণ এর অলংকরণ। মেহরাবের চারপাশে ফুল, লতাপাতা ও ঝুলন্ত শিকলের নকশা রয়েছে। পাথরের জালি ও অলংকরণে জ্যামিতিক নকশারও ব্যবহার দেখা যায়।
স্থাপত্যের এই অলংকরণ শুধু সৌন্দর্য বাড়ায়নি; এটি তৎকালীন কারিগরদের পাথর খোদাইয়ের দক্ষতারও সাক্ষ্য বহন করছে।
প্রাচীরঘেরা চত্বর ও ঐতিহাসিক প্রবেশদ্বার
মসজিদটি একটি প্রাচীরঘেরা চত্বরের মধ্যে অবস্থিত। চত্বরে প্রবেশের জন্য রয়েছে আকর্ষণীয় প্রবেশদ্বার। বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, প্রবেশদ্বারটিতে প্রহরীদের দাঁড়ানোর ব্যবস্থাও ছিল।
এ ধরনের পরিকল্পনা থেকে বোঝা যায়, মসজিদটি শুধু একটি নামাজের জায়গা হিসেবেই নয়, বরং একটি নির্দিষ্ট সামাজিক ও স্থাপত্যিক পরিসরের অংশ হিসেবে গড়ে উঠেছিল।
সামনে বিশাল দিঘি
মসজিদের পূর্বদিকে উত্তর-দক্ষিণমুখী একটি দীর্ঘ দিঘি রয়েছে। স্থানীয়ভাবে এটি কুসুম্বা দিঘি নামে পরিচিত। মসজিদ ও দিঘির এই পাশাপাশি অবস্থান পুরো স্থাপনাটিকে দিয়েছে ভিন্ন মাত্রা।
দিঘির ঘাটে রয়েছে শান বাঁধানো সিঁড়ি। মুসল্লিদের ওজু ও স্থানীয় মানুষের দৈনন্দিন ব্যবহারের সঙ্গে জলাশয়টির সম্পর্ক ছিল বলে স্থানীয়ভাবে প্রচলিত রয়েছে।
দিঘিকে ঘিরে নানা লোককথাও প্রচলিত। তবে লোকমুখে থাকা এসব গল্পের সঙ্গে প্রামাণ্য ইতিহাসের পার্থক্য করা জরুরি।
‘কাজী মঞ্চ’ ঘিরে স্থানীয় ইতিহাস
মসজিদের ভেতরের একটি উঁচু আসন স্থানীয়ভাবে ‘কাজী মঞ্চ’ নামে পরিচিত। নওগাঁ জেলা প্রশাসনের পর্যটন তথ্য অনুযায়ী, প্রচলিত ধারণা হলো—এই উঁচু আসনে বসে কাজী বা বিচারক বিচারকার্য পরিচালনা করতেন।
এ তথ্যের ঐতিহাসিক প্রমাণের সীমাবদ্ধতা থাকলেও স্থানীয় ঐতিহ্য ও জনশ্রুতিতে এর বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।
১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পেও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল
কুসুম্বা মসজিদের ইতিহাস শুধু নির্মাণ ও স্থাপত্যের ইতিহাস নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রাকৃতিক দুর্যোগের স্মৃতিও। বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ১৮৯৭ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পে মসজিদটি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে সংরক্ষণ ও সংস্কারের মাধ্যমে স্থাপনাটিকে টিকিয়ে রাখা হয়েছে।
পুরাকীর্তি হিসেবে মসজিদটির সংরক্ষণে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের উদ্যোগও রয়েছে। বাংলাদেশের প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের ইতিহাসে কুসুম্বা মসজিদের সংস্কারকাজের উল্লেখও রয়েছে।
আজও নামাজ হয়, আসে পর্যটক
প্রাচীন স্থাপনা হলেও কুসুম্বা মসজিদ কোনো নিস্তব্ধ প্রত্নস্থল নয়। এখানে এখনো নিয়মিত নামাজ আদায় করেন মুসল্লিরা। পাশাপাশি প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে দর্শনার্থীরাও আসেন।
ছুটির দিন ও বিশেষ ধর্মীয় উপলক্ষে দর্শনার্থীর সংখ্যা বাড়ে। মসজিদের স্থাপত্য, পাথরের অলংকরণ, ঐতিহাসিক পরিবেশ এবং সামনে থাকা দিঘি—সবকিছু মিলিয়ে এটি নওগাঁর অন্যতম আকর্ষণীয় দর্শনীয় স্থান।
ইতিহাস আর স্থাপত্যের একসঙ্গে পাঠ
কুসুম্বা শাহী মসজিদের বিশেষত্ব শুধু এর বয়সে নয়। এর গুরুত্ব লুকিয়ে আছে নির্মাণশৈলী, পাথরের ব্যবহার, ছয় গম্বুজের বিন্যাস, অষ্টকোণাকৃতির বুরুজ, মেহরাবের অলংকরণ এবং বাংলার নিজস্ব স্থাপত্যরীতির সমন্বয়ে।
প্রত্নতত্ত্বের দৃষ্টিতেও এটি গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাপিডিয়া কুসুম্বা মসজিদকে সুলতানি আমলের শেষদিকের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর একটি হিসেবে উল্লেখ করেছে।
পাথরের দেয়ালে সময়ের স্বাক্ষর
একসময় যেসব কারিগর পাথর কেটে মেহরাবের নকশা তৈরি করেছিলেন, তাদের নাম ইতিহাস হয়তো সংরক্ষণ করেনি। কিন্তু তাদের হাতের কাজ এখনো টিকে আছে।
চারপাশের আধুনিকতার মাঝেও কালো পাথরের দেয়াল, ছয়টি গম্বুজ আর সামনের দিঘি যেন সময়ের সীমানা পেরিয়ে দর্শনার্থীকে নিয়ে যায় ১৫৫৮-৫৯ খ্রিস্টাব্দের বাংলায়।
কুসুম্বা শাহী মসজিদ তাই শুধু একটি পুরনো মসজিদ নয়—এটি বাংলার স্থাপত্য, ধর্মীয় সংস্কৃতি ও মধ্যযুগীয় ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল।
:::
তথ্যসূত্র হিসেবে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর, বাংলাপিডিয়া ও নওগাঁ জেলা প্রশাসনের তথ্য ব্যবহার করেছি। বিশেষ করে নির্মাণকাল ও নির্মাতার বিষয়ে আগের খসড়ার তুলনায় সরকারি প্রত্নতাত্ত্বিক সূত্রের তথ্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।

