কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার: আইনের সীমাবদ্ধতা, মাদকের ছোবল ও পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগ
গণদিগন্ত বিশেষ প্রতিবেদন
রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় কিশোরদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার প্রবণতা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করছে। চুরি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও মাদক কারবার থেকে শুরু করে সংঘবদ্ধ হামলা ও হত্যার মতো গুরুতর অপরাধেও কিশোরদের ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেদের আধিপত্য প্রদর্শন এবং প্রতিপক্ষকে হুমকি দেওয়ার ঘটনাও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
সম্প্রতি কুমিল্লায় ১৩ বছর বয়সী কিশোর ইশায়াত শাহরিয়ার ওরফে অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধারের পর কিশোর গ্যাং ও কিশোর অপরাধ নিয়ে আবারও আলোচনা শুরু হয়েছে। ওই ঘটনার পর কুমিল্লায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক অভিযানে বিপুলসংখ্যক ব্যক্তিকে আটক বা গ্রেপ্তারের তথ্য সামনে এসেছে।
তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান বাড়লেও প্রশ্ন উঠছে—শুধু কিশোরদের আটক করে কি এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব?
ঢাকার অপরাধী চক্রে তরুণদের আধিক্য
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, রাজধানীতে তালিকাভুক্ত অপরাধী চক্রের সদস্যদের একটি বড় অংশই বয়সে তরুণ।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, তালিকাভুক্ত ৮৯৩ জনের মধ্যে ১৫২ জনের বয়স ১৮ বছরের নিচে। অর্থাৎ মোট সদস্যের প্রায় ১৭ শতাংশ শিশু-কিশোর বয়সী।
এ ছাড়া ১৮ থেকে ২০ বছর বয়সী সদস্য রয়েছেন আরও ৩২২ জন। দুই শ্রেণি মিলিয়ে ২০ বছর বা তার কম বয়সী সদস্যের সংখ্যা ৪৭৪ জন—যা তালিকাভুক্ত মোট সদস্যের প্রায় ৫৩ শতাংশ।
এই পরিসংখ্যান রাজধানীর অপরাধী নেটওয়ার্কে কিশোর ও তরুণদের সম্পৃক্ততার বিষয়টি নতুন করে সামনে এনেছে।
অপরাধের ধরনও হচ্ছে ভয়াবহ
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন কিশোর ও তরুণ অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, ছিনতাই, ডাকাতি, ইভটিজিং, মাদক ব্যবসা এবং অর্থের বিনিময়ে হত্যাকাণ্ডের মতো গুরুতর অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে।
কিছু ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি বা অপরাধী চক্রের বড়দের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ ও পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগও রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কিশোররা অনেক সময় নিজেরাই অপরাধী নেটওয়ার্ক তৈরি করে না। বরং অভিজ্ঞ অপরাধীরা বিভিন্ন স্বার্থে তাদের ব্যবহার করে। ফলে কিশোর অপরাধের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হলে কিশোরের পাশাপাশি তাদের ব্যবহারকারী প্রাপ্তবয়স্ক অপরাধীদেরও শনাক্ত করতে হবে।
আইনের জটিলতা কতটা বড় বাধা?
কিশোর অপরাধ মোকাবিলায় আইনগত কাঠামোর বাস্তব প্রয়োগ নিয়েও রয়েছে নানা জটিলতা।
পুলিশ কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, শিশু আইন, ২০১৩ অনুযায়ী ১৮ বছর বা তার কম বয়সী অপরাধীদের জন্য আলাদা আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। তাদের ক্ষেত্রে প্রাপ্তবয়স্কদের মতো সাধারণ বিচার ও কারাব্যবস্থা প্রযোজ্য নয়।
ফলে গুরুতর অপরাধের অভিযোগ থাকলেও কিশোরদের ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিকভাবে প্রাপ্তবয়স্ক অপরাধীদের মতো ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ সীমিত।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জনবল ও অবকাঠামোগত সংকট। শিশু-কিশোরদের নিয়ে কাজ করার জন্য বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত কর্মকর্তার ঘাটতি এবং দায়িত্ব পরিবর্তনের কারণে অনেক সময় ধারাবাহিক কার্যক্রমও ব্যাহত হয় বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
পরিবার কোথায়?
কিশোর অপরাধের বিস্তার ঠেকাতে পরিবারের ভূমিকার ওপর জোর দিয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) মোহাম্মদ ওসমান গনি।
তার মতে, সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে এবং সন্ধ্যার পর কোথায় সময় কাটাচ্ছে—এসব বিষয়ে অভিভাবকদের নিয়মিত খোঁজ রাখা জরুরি।
শুধু শাসন নয়, সন্তানের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলে তার মানসিক পরিবর্তন, বন্ধু নির্বাচন ও চলাফেরার বিষয়ে সচেতন থাকার পরামর্শও দিয়েছেন তিনি।
অভিভাবকদের উদ্বেগ বাড়ছে
কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন অভিভাবকরাও।
রাজধানীর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের ভাষ্য, ভালো পরিবারের সন্তানও ভুল বন্ধুত্ব, মাদক কিংবা অনুকূল পরিবেশের অভাবে অপরাধের দিকে ঝুঁকে পড়তে পারে।
তাই সন্তান কার সঙ্গে মিশছে, কোথায় যাচ্ছে এবং অবসর সময় কীভাবে কাটাচ্ছে—এসব বিষয়ে নিয়মিত নজরদারি প্রয়োজন বলে মনে করছেন তারা।
মাদক: অপরাধে প্রবেশের অন্যতম দরজা
কিশোর অপরাধের সঙ্গে মাদকের সম্পর্ককে অন্যতম বড় ঝুঁকি হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ২০২৫ সালের একটি সমীক্ষার বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে মাদকাসক্ত মানুষের সংখ্যা ৮৩ লাখ। এর মধ্যে শিশু-কিশোরের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য।
মাদক নিয়ন্ত্রণ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, কিশোরদের শুধু মাদক গ্রহণের জন্য নয়, অনেক সময় পরিবহন ও সরবরাহের কাজেও ব্যবহার করা হয়।
চট্টগ্রাম মেট্রো (দক্ষিণ)-এর মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ কার্যালয়ের উপপরিচালক ও গবেষক মো. মানজুরুল ইসলামের ভাষ্য, শিশুদের সাধারণত কম সন্দেহ করা হয় এবং তুলনামূলক কম অর্থে তাদের কাজে লাগানো যায়—এ কারণে মাদক কারবারিরা তাদের ব্যবহার করে।
একবার মাদক পরিবহনের মতো কাজে জড়িয়ে পড়ার পর অনেক কিশোর ধীরে ধীরে মাদকের সংস্পর্শে আসে এবং পরবর্তীতে নিজেরাই আসক্ত হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকে।
কীভাবে অপরাধী নেটওয়ার্কে ঢুকছে কিশোররা?
বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণে কিশোরদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। এর মধ্যে রয়েছে—
খারাপ সঙ্গ: বড়দের বা বন্ধুদের প্রভাবে অপরাধী চক্রে প্রবেশ।
মাদক: মাদক গ্রহণ বা পরিবহনের মাধ্যমে অপরাধজগতে যুক্ত হওয়ার ঝুঁকি।
পারিবারিক নজরদারির অভাব: সন্তানের দৈনন্দিন জীবন সম্পর্কে পর্যাপ্ত খোঁজ না রাখা।
অপরাধী চক্রের পৃষ্ঠপোষকতা: বড় অপরাধীদের স্বার্থে কিশোরদের ব্যবহার।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম: অনলাইনে আধিপত্য দেখানোর প্রবণতা থেকে বাস্তব জীবনে সংঘাত ও সহিংসতায় জড়িয়ে পড়া।
শুধু কিশোরকে ধরলে সমস্যার সমাধান হবে না
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হকের মতে, দারিদ্র্য, পারিবারিক শিক্ষা, সামাজিক পরিবেশ ও মাদক—সবগুলো কারণ কিশোর গ্যাং বিস্তারে ভূমিকা রাখছে।
তার মতে, শুধু পুলিশি অভিযান চালিয়ে এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। কিশোরদের অপরাধে ব্যবহারকারী অর্থদাতা, মাদকচক্র এবং পৃষ্ঠপোষকদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে।
একই সঙ্গে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় সম্প্রদায়ের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
পুলিশের কঠোর অবস্থান
অপরাধ দমনে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছে পুলিশ সদরদফতরও।
পুলিশ মহাপরিদর্শক আলী হোসেন ফকিরের বক্তব্য অনুযায়ী, অপরাধীর কোনো দলীয় পরিচয় বিবেচনার সুযোগ নেই। মাদক ব্যবসায়ী, সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
কিশোর অপরাধীদের ক্ষেত্রেও বিদ্যমান আইনি কাঠামো অনুসরণ করে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
পাশাপাশি মাদকবিরোধী অভিযানে কঠোর অবস্থানের সঙ্গে কমিউনিটি পুলিশিংয়ের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সামনে যে চ্যালেঞ্জ
কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার ঠেকাতে সংশ্লিষ্টদের সামনে কয়েকটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে—
১. শিশু-কিশোরদের জন্য বিদ্যমান আইন কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা।
২. পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার জনবল ও অবকাঠামো বাড়ানো।
৩. কিশোরদের মাদক থেকে দূরে রাখা।
৪. কিশোরদের ব্যবহারকারী প্রাপ্তবয়স্ক অপরাধীদের শনাক্ত করা।
৫. পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত কাউন্সেলিং ও নজরদারি নিশ্চিত করা।
৬. অপরাধী চক্রের পৃষ্ঠপোষকতা ও অর্থের উৎস চিহ্নিত করা।
৭. খেলাধুলা, সংস্কৃতি, কারিগরি শিক্ষা ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে কিশোরদের যুক্ত করা।
অভিযান নয়, প্রয়োজন সমন্বিত সমাধান
কুমিল্লার সাম্প্রতিক ঘটনা এবং রাজধানীর অপরাধী চক্রের বয়সভিত্তিক তথ্য কিশোর অপরাধের বিস্তারের একটি উদ্বেগজনক চিত্র সামনে এনেছে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, কিশোরদের শুধু অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করে গ্রেপ্তার বা শাস্তি দিলেই সমস্যার শিকড় দূর হবে না। কেন তারা অপরাধে ঢুকছে, কারা তাদের ব্যবহার করছে এবং কোন সামাজিক পরিবেশ তাদের অপরাধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে।
মাদক, খারাপ সঙ্গ, পারিবারিক অবহেলা, সামাজিক মূল্যবোধের সংকট এবং অপরাধী চক্রের পৃষ্ঠপোষকতা—সবগুলো কারণ একসঙ্গে মোকাবিলা করলেই কিশোর অপরাধ নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘমেয়াদি ফল পাওয়া সম্ভব।
গণদিগন্ত বিশেষ প্রতিবেদন

