গণভোটের ম্যান্ডেট পাশ কাটিয়ে সংবিধান সংশোধন নয়: ১১ দলীয় ঐক্য
গণদিগন্ত ডেস্ক
গণভোটে জনগণের দেওয়া রায়কে পাশ কাটিয়ে জাতীয় সংসদের বিশেষ কমিটির মাধ্যমে সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ গ্রহণযোগ্য নয় বলে জানিয়েছে ১১ দলীয় ঐক্য।
রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) দুপুরে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে জোটটির পক্ষ থেকে এ অবস্থান তুলে ধরেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার। সংবাদ সম্মেলনে ১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ সভাপতিত্ব করেন।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ১১ দলীয় ঐক্য জুলাই জাতীয় সনদের ভিত্তিতে সাংবিধানিক সংস্কার এবং গণভোটে জনগণের দেওয়া রায় বাস্তবায়নের পক্ষে। তবে গণভোটে অনুমোদিত প্রক্রিয়ার পরিবর্তে সংসদীয় বিশেষ কমিটির মাধ্যমে মৌলিক সাংবিধানিক সংস্কার করার উদ্যোগ তারা গ্রহণ করবে না।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, গণভোটে শুধু পৃথক কিছু সংস্কারের বিষয়ে মতামত নেওয়া হয়নি; বরং সাংবিধানিক সংস্কার বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া ও কাঠামো নিয়েও জনগণের মতামত নেওয়া হয়েছে। ফলে গণভোটের মাধ্যমে পাওয়া ম্যান্ডেটের বাইরে অন্য কোনো প্রক্রিয়াকে একই মর্যাদা দেওয়ার সুযোগ নেই বলে দাবি করেন তিনি।
সংসদ ও সংস্কার পরিষদের ক্ষমতার উৎস আলাদা: ১১ দল
মিয়া গোলাম পরওয়ারের দাবি, জাতীয় সংসদ সংবিধানসৃষ্ট একটি প্রতিষ্ঠান। অন্যদিকে গণভোটের মাধ্যমে অনুমোদিত সাংবিধানিক সংস্কার বাস্তবায়নের জন্য নির্ধারিত প্রক্রিয়ার ক্ষমতার উৎস জনগণের সরাসরি ভোট।
তিনি বলেন, একই ব্যক্তি সংসদ সদস্য এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হতে পারেন; কিন্তু দুটি প্রতিষ্ঠানের আইনগত পরিচয়, ক্ষমতার উৎস ও দায়িত্ব এক নয়।
১১ দলীয় ঐক্যের পক্ষ থেকে আরও বলা হয়, সংবিধানের মৌলিক কাঠামো পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সংসদের সংশোধনী ক্ষমতা সীমাহীন নয়। এ ক্ষেত্রে শুধু সংসদে প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে কি না, সেটিই বিবেচ্য বিষয় নয়; সংশ্লিষ্ট ক্ষমতার উৎস এবং জনগণের দেওয়া ম্যান্ডেটও বিবেচনায় নিতে হবে বলে মত দেন তিনি।
যেসব সংস্কারের কথা বলেছে ১১ দল
সংবাদ সম্মেলনে জুলাই জাতীয় সনদে প্রস্তাবিত বিভিন্ন সাংবিধানিক সংস্কারের বিষয় তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে রয়েছে—
– দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভা ও ১০০ সদস্যের উচ্চকক্ষ;
– রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য;
– প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিতকরণ;
– গুরুত্বপূর্ণ একাধিক পদে একই ব্যক্তির দায়িত্ব পালনে বিধিনিষেধ;
– নির্বাচন কমিশনসহ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার;
– বিচার বিভাগের স্বাধীনতা;
– বিকেন্দ্রীকরণসহ বিভিন্ন সাংবিধানিক পরিবর্তন।
জোটটির বক্তব্য, এসব প্রস্তাব রাষ্ট্রের ক্ষমতা কাঠামো ও বিভিন্ন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের পারস্পরিক সম্পর্কের সঙ্গে যুক্ত। তাই সাধারণ সংসদীয় সংশোধনী প্রক্রিয়ায় এগুলো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে সাংবিধানিক ও আইনি জটিলতার সৃষ্টি হতে পারে।
১১ দলীয় ঐক্যের ছয় দাবি
সংবাদ সম্মেলনে মিয়া গোলাম পরওয়ার ছয়টি দাবি তুলে ধরেন। দাবিগুলো হলো—
১. গণভোটে জনগণের দেওয়া রায় যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা।
২. জুলাই জাতীয় সনদে অন্তর্ভুক্ত এবং গণভোটে অনুমোদিত সাংবিধানিক সংস্কার বাস্তবায়ন করা।
৩. গণভোটে অনুমোদিত প্রক্রিয়া পাশ কাটিয়ে সংসদীয় বিশেষ কমিটির মাধ্যমে মৌলিক সাংবিধানিক সংস্কার বাস্তবায়নের উদ্যোগ প্রত্যাহার করা।
৪. নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ করিয়ে পরিষদ কার্যকর করা।
৫. জনগণের সম্মতি ও গণভোটের ম্যান্ডেটকে পাশ কাটিয়ে সংবিধানের মৌলিক কাঠামো সংশ্লিষ্ট পরিবর্তনের উদ্যোগ থেকে বিরত থাকা।
৬. জনগণের প্রত্যাশা, গণভোটের রায় ও রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে রাষ্ট্রীয় ও সাংবিধানিক সংস্কার এগিয়ে নেওয়া।
‘এখনো প্রক্রিয়া কার্যকর করার সুযোগ রয়েছে’
সংবিধান সংস্কার পরিষদের আইনগত ভিত্তি নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে বলেও সংবাদ সম্মেলনে উল্লেখ করা হয়।
মিয়া গোলাম পরওয়ারের দাবি, ২০২৫ সালের ১৩ নভেম্বর সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের জন্য যে আদেশ দেওয়া হয়েছে, সেটিকে আইনগত ভিত্তিহীন বলার সুযোগ নেই। তার মতে, সংবিধানের ১৫২ অনুচ্ছেদে ‘আইন’-এর সংজ্ঞার আলোকে ওই আদেশের আইনগত ভিত্তি রয়েছে।
তিনি বলেন, গণভোটের রায় বাস্তবায়নের জন্য এখনো সংবিধান সংস্কার পরিষদ কার্যকর করার সুযোগ রয়েছে। নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ দেওয়া, পরিষদের অধিবেশন আহ্বান এবং গণভোটে নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া সম্ভব বলেও দাবি করেন তিনি।
বিশেষ কমিটির উদ্যোগ প্রত্যাখ্যান
১১ দলীয় ঐক্যের পক্ষ থেকে জাতীয় সংসদের সংবিধান সংশোধনসংক্রান্ত বিশেষ কমিটির উদ্যোগ প্রত্যাখ্যানের ঘোষণা দেওয়া হয়। জোটটির নেতারা জানান, জনগণের গণভোটের রায় ও জুলাই জাতীয় সনদের ভিত্তিতে সাংবিধানিক সংস্কার বাস্তবায়নের দাবিতে তাদের রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে।
সংবাদ সম্মেলনে জোটের নেতারা সাম্প্রতিক লংমার্চে গণমাধ্যম, রাজনৈতিক দল, সাধারণ মানুষ, ব্যবসায়ী ও প্রশাসনের সহযোগিতার জন্য কৃতজ্ঞতা জানান। দীর্ঘ কর্মসূচির কারণে কারও ভোগান্তি হয়ে থাকলে তারা দুঃখ প্রকাশ করেন।
সংবাদ সম্মেলনে ১১ দলীয় ঐক্যের বিভিন্ন শরিক দলের নেতারাও উপস্থিত ছিলেন।

