ঢাবিতে এক বছরে ডাকসুর ২২৫ উদ্যোগ, পরিবহন-স্বাস্থ্য-আবাসনে নানা পরিবর্তন
ডেস্ক রিপোর্ট :
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) দায়িত্ব নেওয়ার এক বছরে ক্যাম্পাসের শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, পরিবহন, আবাসন, গবেষণা, দক্ষতা উন্নয়ন ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ২২৫টি কাজ সম্পন্ন বা উদ্যোগ নেওয়ার দাবি করেছে।
ডাকসুর নেতৃবৃন্দের ভাষ্য, দীর্ঘদিনের স্থবিরতার পর বর্তমান কমিটি দায়িত্ব নেওয়ার পর শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে ধারাবাহিকভাবে কাজ করেছে। তবে এসব উদ্যোগের কিছু বিষয়ে শিক্ষকদের একাংশ ও বিরোধী পক্ষের সমালোচনাও রয়েছে।
ডাকসুর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছ থেকে ৩৫ লাখ টাকা বরাদ্দ পাওয়া গেলেও বিভিন্ন উদ্যোগ, স্পনসরশিপ ও অন্যান্য কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রায় ৩৫ কোটি টাকা সমমূল্যের ‘ইমপ্যাক্ট’ তৈরি করা হয়েছে। তাদের দাবি, মোট ২২৫টি কাজ ৩৩টি খাতে বিভক্ত।
স্বাস্থ্যসেবায় সংস্কার
স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়নে বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে ডাকসু। প্রায় আড়াই কোটি টাকা ব্যয়ে একটি অ্যাম্বুলেন্স, এয়ার কন্ডিশনার, এক্স-রে ও ইসিজি মেশিন, এনালাইজার, মাইক্রোস্কোপ, হাসপাতাল বেড, আলমিরা, চেয়ার ও ডেস্কসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া ৫০ শতাংশ ছাড়ে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার লক্ষ্যে আমেরিকান ওয়েলনেস সেন্টারের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরের কথাও জানিয়েছে ডাকসু।
আইন ও মানবাধিকার সংক্রান্ত কার্যক্রমের আওতায় ১১৯ জন শিক্ষার্থীকে নিরাপত্তা ও আইনি সহায়তা দেওয়ার দাবি করা হয়েছে। পাশাপাশি আবাসিক হলগুলোতে ছারপোকা নিয়ন্ত্রণে একাধিকবার ওষুধ প্রয়োগ এবং বিভিন্ন পরিচ্ছন্নতা ও মশক নিধন কর্মসূচি পরিচালনার কথা জানানো হয়েছে।
আবাসন ও হল ব্যবস্থাপনায় উদ্যোগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসন সংকট নিরসনে নতুন হল নির্মাণের উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেছে ডাকসু। অন্তত ১ হাজার ৫০০ ছাত্রী ধারণক্ষমতার একটি ছাত্রী হল নির্মাণের কার্যক্রম এগিয়ে নিতে চীনা রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে একাধিকবার আলোচনা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় প্রায় ২ হাজার ৮০০ কোটি টাকার বাজেট বাস্তবায়নে প্রশাসনের সঙ্গে কাজ এবং দ্রুত পাঁচটি হলের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের বিষয়ে সম্মতি পাওয়ার দাবি করেছে ডাকসু।
এ ছাড়া ছাত্রীদের ইবাদতের জন্য কার্জন হলের কমনরুমে নির্ধারিত স্থান ও মসজিদ সংস্কার এবং কমনরুম ও টিএসসির নামাজের স্থানে নতুন কার্পেট দেওয়ার কথাও জানানো হয়েছে।
আবাসিক হলগুলোতে দীর্ঘদিনের আলোচিত গণরুম ও গেস্টরুম সংস্কৃতি যেন ফিরে না আসে, সে বিষয়ে কাজ অব্যাহত রাখার কথাও বলেছে ডাকসু।
পরিবহন ব্যবস্থায় পরিবর্তনের দাবি
শিক্ষার্থীদের যাতায়াত সহজ করতে পরিবহন খাতেও একাধিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে সংগঠনটি। জরাজীর্ণ বাস পরিবর্তন এবং ট্রিপ ও সেবা বাড়ানোর লক্ষ্যে ইউজিসিসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠক করে প্রায় দুই কোটি টাকার বাজেটের ব্যবস্থা করার দাবি করা হয়েছে।
এ ছাড়া সব রুটে সান্ধ্যকালীন বাস ট্রিপ চালু, ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরীণ যাতায়াতে ১৯টি ইলেকট্রিক শাটল চালু এবং সব ছাত্রী হলকে ক্যাম্পাস শাটলের আওতায় আনার কথা জানানো হয়েছে।
ক্ষণিকা রুটের বাসগুলোর এক্সপ্রেসওয়ে টোল ফ্রি করার বিষয়েও বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন অফিসের সঙ্গে সমন্বয়ের কথা জানিয়েছে ডাকসু।
শিক্ষা, গবেষণা ও দক্ষতা উন্নয়ন
শিক্ষার্থীদের গবেষণা ও উচ্চশিক্ষায় উৎসাহিত করতে চারটি সেমিনার আয়োজন এবং সাতটি আন্তর্জাতিক জার্নালে বিনামূল্যে প্রবেশাধিকার দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
কেন্দ্রীয় লাইব্রেরিতে আলো স্বল্পতা দূর করতে নতুন লাইটিং এবং বিজ্ঞান লাইব্রেরিতে ফ্যান সংযোজন করা হয়েছে। পাশাপাশি ২৯টি ই-রিসোর্স সাবস্ক্রাইবের ব্যবস্থা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে ডাকসু।
দক্ষতা উন্নয়নের অংশ হিসেবে সফট স্কিল প্রশিক্ষণ, চারটি প্রেজেন্টেশন ওয়ার্কশপ, স্পোকেন ইংলিশের চারটি কোর্স এবং বিভিন্ন পেশাজীবী ও শিক্ষাবিদদের অংশগ্রহণে বাংলাদেশ স্কিল সামিট আয়োজন করা হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের জন্য বিভিন্ন প্রশিক্ষণ
ডাকসুর উদ্যোগে বিএনসিসি, রোভার স্কাউট ও রেঞ্জার সদস্যদের অংশগ্রহণে লাইফ স্কিল প্রশিক্ষণের আওতায় ৫০০ শিক্ষার্থীকে মোটরসাইকেল চালনা প্রশিক্ষণ দেওয়ার কথা জানানো হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৮টি হলে প্রাথমিক চিকিৎসাবিষয়ক প্রশিক্ষণ এবং দুটি ইনস্টিটিউট ও তিনটি ছাত্রী হলে সেলফ ডিফেন্স প্রশিক্ষণ আয়োজন করা হয়েছে। ছাত্রীদের জন্য পৃথক জিমনেসিয়াম নির্মাণের কাজ শুরুর কথাও জানিয়েছে ডাকসু।
সাংস্কৃতিক ও সামাজিক কার্যক্রম
বিজয় দিবস ও শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস উপলক্ষে বিভিন্ন কর্মসূচির পাশাপাশি বিজয় কুইজ, আলপনা উৎসব, সাইকেল র্যালি, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ, চলচ্চিত্র প্রদর্শনী ও প্রকাশনা কার্যক্রম আয়োজন করা হয়েছে।
এ ছাড়া নবান্ন উৎসব, নাট্যোৎসব, সীরাতুন্নবী (সা.) সন্ধ্যা ও সীরাত প্রতিযোগিতাসহ বিভিন্ন সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনের কথাও জানানো হয়েছে।
শিক্ষক মূল্যায়ন ওয়েবসাইট নিয়ে আলোচনা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো শিক্ষকদের ক্লাস ও পাঠদান মূল্যায়নের জন্য একটি স্বতন্ত্র ওয়েবসাইট চালু করার দাবি করেছে ডাকসু। এই উদ্যোগ শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রশংসা পেলেও শিক্ষকদের একাংশের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ডাকসুর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, শিক্ষার্থীদের মতামত ও পাঠদানের মান উন্নয়নের লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ডাকসুর বক্তব্য
ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক এস এম ফরহাদ বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর শিক্ষার্থীদের দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হয়েছে। বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা ও প্রতিকূলতার মধ্যেও শিক্ষার্থীদের কল্যাণে কাজ চালিয়ে যাওয়ার দাবি করেন তিনি।
তিনি বলেন, নির্বাচনের পর বিভিন্ন প্রার্থী ও প্যানেলের ইশতেহারগুলো পর্যালোচনা করে সেগুলোর ওপর কাজ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে ডাকসুর সহসভাপতি (ভিপি) সাদিক কায়েম বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্ব ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে তারা কাজ করেছেন। তাঁর দাবি, এখন পর্যন্ত প্রায় ২২৫টি কাজ সম্পন্ন হয়েছে, যা ৩৩টি খাতে বিভক্ত।
মেয়াদ আরও ৯০ দিন
ডাকসুর বর্তমান কমিটির মেয়াদ শেষ হলেও বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখার স্বার্থে প্রশাসন তাদের দায়িত্বের মেয়াদ আরও ৯০ দিন বাড়িয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে অনুমোদন ছাড়া ডাকসুর কোনো কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়ার বিষয়টিও সামনে এসেছে। এর মধ্যেও শিক্ষার্থীদের স্বার্থে কার্যক্রম অব্যাহত রাখার কথা জানিয়েছে ডাকসু।
সব মিলিয়ে এক বছরের কার্যক্রমে স্বাস্থ্য, পরিবহন, আবাসন, শিক্ষা, গবেষণা ও দক্ষতা উন্নয়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে একাধিক উদ্যোগ নেওয়ার দাবি করেছে ডাকসু। এসব উদ্যোগের বাস্তব প্রভাব, দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব এবং শিক্ষার্থীদের ওপর এর ফলাফল নিয়ে ভবিষ্যতে আরও মূল্যায়নের সুযোগ থাকবে।

