নিজস্ব প্রতিবেদক | গণদিগন্ত

সন্ধ্যার ব্যস্ত সময়। রোগী ও স্বজনদের ভিড়ে তখন । হঠাৎ নতুন ভবনের ওপরের অংশে ধোঁয়া দেখা যায়। মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে আগুনের খবর। এরপরই শুরু হয় আতঙ্ক, ছোটাছুটি আর নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য রোগী-স্বজনদের মরিয়া চেষ্টা।

কীভাবে আগুন লাগল? কোথা থেকে আগুনের সূত্রপাত? আগুন কি ওয়ার্ডে ছড়িয়ে পড়েছিল? আর আগুনের চেয়ে আতঙ্কই কি বড় বিপদ তৈরি করেছিল?

ঘটনার পর প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদন ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য বিশ্লেষণ করে পাওয়া যাচ্ছে, আগুনের মূল উৎস ছিল হাসপাতালের নতুন ভবনের একটি লিফটের কন্ট্রোল রুম/লিফটের অংশ। তবে আগুন লাগার সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো তদন্তের মাধ্যমে চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করা হয়নি।

শুরুটা যেভাবে

সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যার দিকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নতুন ভবনে হঠাৎ ধোঁয়া দেখা যায়। ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, নতুন ভবনের একটি বন্ধ লিফটের কন্ট্রোল রুমের অংশে আগুনের সূত্রপাত হয়।

প্রাথমিকভাবে কন্ট্রোলার মেশিনের বোর্ডে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে অতিরিক্ত উত্তাপ সৃষ্টি হয়ে আগুন লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে এটি এখনো চূড়ান্ত তদন্তের ফল নয়।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্যে আবার লিফটের বাইরের প্লাস্টিক কাভারিংয়ে আগুন লাগার কথা উঠে এসেছে। অর্থাৎ আগুনের ঠিক কোন অংশ থেকে সূত্রপাত হয়েছিল, সেটি নিয়েও বিস্তারিত তদন্ত প্রয়োজন।

আগুনের চেয়ে দ্রুত ছড়ায় আতঙ্ক

ঘটনার সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক ছিল আগুনের ধোঁয়া ও আতঙ্ক। নতুন ভবনের বিভিন্ন তলায় ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়লে রোগী ও স্বজনদের মধ্যে ভয় তৈরি হয়।

অনেকেই আগুনের প্রকৃত অবস্থান না জেনেই দ্রুত নিচে নামার চেষ্টা করেন। গুরুতর অসুস্থ রোগীদের স্বজনরাও তাদের নিয়ে সিঁড়ির দিকে ছুটে যান। ফলে সিঁড়িতে তৈরি হয় তীব্র ভিড় ও হুড়োহুড়ি। বিভিন্ন প্রতিবেদনে এ সময় বেশ কয়েকজন আহত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায়, মুহূর্তের মধ্যে হাসপাতালের পরিবেশ বদলে যায়। চিকিৎসাধীন রোগীদের স্বজনেরা একদিকে স্বজনকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিলেন, অন্যদিকে হাসপাতালকর্মী, নিরাপত্তাকর্মী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেন।

আগুন কি ওয়ার্ডে ছড়িয়ে পড়েছিল?

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, আগুন কোনো রোগী ওয়ার্ডে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েনি। আগুন মূলত লিফটের অংশেই সীমাবদ্ধ ছিল। তবে ধোঁয়া বিভিন্ন তলায় ছড়িয়ে পড়ায় পরিস্থিতি ভয়াবহ মনে হয় এবং রোগী-স্বজনদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, কোনো ওয়ার্ডে বড় ধরনের ক্ষতি হয়নি।

এখানেই ঘটনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে আসে—হাসপাতালের মতো জনবহুল ভবনে আগুন ছোট হলেও ধোঁয়া, আতঙ্ক ও মানুষের একসঙ্গে বের হওয়ার চেষ্টা বড় ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

ফায়ার সার্ভিসের তৎপরতা

আগুনের খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিস দ্রুত ঘটনাস্থলে যায়। বিভিন্ন প্রতিবেদনে ইউনিটের সংখ্যা নিয়ে পার্থক্য থাকলেও ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, একাধিক ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করে। বাসসের প্রতিবেদনে চারটি ইউনিট প্রায় এক ঘণ্টা কাজ করে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার কথা বলা হয়েছে; অন্যদিকে পরে প্রকাশিত প্রতিবেদনে পাঁচটি স্টেশনের ১০টি ইউনিট ঘটনাস্থলে পাঠানোর তথ্য পাওয়া যায়।

📰

আপনার এলাকার সংবাদ প্রকাশ করতে চান?

এলাকার গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ, ঘটনা ও জনদুর্ভোগের কথা তুলে ধরুন সবার সামনে। ছবি ও প্রয়োজনীয় তথ্যসহ আপনার সংবাদ পাঠান গণদিগন্তের কাছে।

✉ সংবাদ পাঠান
📢

আপনার ব্যবসার প্রচার হোক সবার কাছে!

আপনার প্রতিষ্ঠান, পণ্য কিংবা সেবার প্রচারে বেছে নিন গণদিগন্ত। অনলাইনে বিজ্ঞাপন দিয়ে পৌঁছে যান অসংখ্য পাঠকের কাছে।

📣 বিজ্ঞাপন দিন
🌐

প্রতিদিনের খবর জানতে সঙ্গে থাকুন গণদিগন্তের!

দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ, রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা, খেলাধুলা ও স্থানীয় খবর জানতে নিয়মিত পড়ুন গণদিগন্ত।

📰 গণদিগন্ত পড়ুন | গ্রাহক হোন

আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার পর পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়। রোগীদের আবার ওয়ার্ডে ফিরিয়ে নেওয়া হয় এবং হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা সচল রাখার চেষ্টা করা হয়।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন: আগুন লাগল কেন?

এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট বা লিফটের বৈদ্যুতিক যন্ত্রাংশে ত্রুটি আগুনের সম্ভাব্য কারণ হিসেবে সামনে এসেছে। তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এটিকে চূড়ান্ত কারণ বলা যাবে না।

কারণ নির্ধারণের পাশাপাশি আরও কিছু বিষয় তদন্তের দাবি রাখে—লিফটটি কেন বন্ধ ছিল, কন্ট্রোল রুমের বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা কতটা নিরাপদ ছিল, অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটা কার্যকর ছিল এবং জরুরি পরিস্থিতিতে রোগীদের সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা কতটা প্রস্তুত ছিল।

মৃত্যুর খবর নিয়ে কেন তৈরি হলো বিভ্রান্তি?

অগ্নিকাণ্ডের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে কয়েকজনের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ে। কোথাও ছয়জনের মৃত্যুর দাবি করা হয়। আবার বিভাগীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে এসব মৃত্যুর তথ্যকে অগ্নিকাণ্ডের কারণে হয়েছে—এমন দাবির বিষয়ে আপত্তি জানানো হয়েছে।

ফলে মৃত্যুর প্রকৃত সংখ্যা এবং মৃত্যুর কারণ নিয়ে তখনই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। প্রশাসনের পক্ষ থেকেও বিষয়টি তদন্ত করে দেখার কথা বলা হয়েছে। তাই যাচাই ছাড়া কোনো মৃত্যুকে অগ্নিকাণ্ডজনিত বলে নিশ্চিত করা ঠিক হবে না।

ঘটনার পর যে প্রশ্নগুলো সামনে

ময়মনসিংহ মেডিকেলে এই অগ্নিকাণ্ড শুধু একটি আগুনের ঘটনা নয়; এটি দেশের বড় হাসপাতালগুলোর অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

একটি হাসপাতালে যেখানে একই সময়ে শত শত রোগী, স্বজন, চিকিৎসক ও কর্মী অবস্থান করেন, সেখানে—

– জরুরি বহির্গমন ব্যবস্থা কতটা কার্যকর?
– লিফট ও বৈদ্যুতিক কন্ট্রোল রুম কতটা নিরাপদ?
– অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা নিয়মিত পরীক্ষা করা হয় কি না?
– আগুন লাগলে রোগীদের দ্রুত সরিয়ে নেওয়ার প্রশিক্ষণ ও পরিকল্পনা আছে কি না?
– ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়লে সিঁড়িতে অতিরিক্ত ভিড় নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা কী?

এসব প্রশ্নের উত্তর এখন গুরুত্বপূর্ণ।

শেষ কথা

১৪ সেপ্টেম্বরের ঘটনাটি দেখিয়েছে, আগুনের আকার ছোট হলেও হাসপাতালের মতো স্থানে আতঙ্ক মুহূর্তের মধ্যে বড় বিপদে রূপ নিতে পারে। প্রাথমিক তথ্য বলছে, আগুনের সূত্রপাত লিফটের কন্ট্রোল রুম/লিফটের অংশে এবং বৈদ্যুতিক ত্রুটি সম্ভাব্য কারণ। কিন্তু আগুনের প্রকৃত কারণ, নিরাপত্তাব্যবস্থার কোনো ঘাটতি ছিল কি না এবং হতাহতের বিষয়ে ছড়ানো বিভিন্ন তথ্যের সত্যতা—সবই তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।

সেদিন ময়মনসিংহ মেডিকেলে আসলে কী ঘটেছিল, তার পূর্ণ উত্তর মিলবে তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের পরই।