কুরআন-সুন্নাহর বিরোধী আইন পাস, আপত্তি জানিয়ে বিরোধী দলের ওয়াকআউট
ডেস্ক রিপোর্ট :
কুরআন-সুন্নাহর বিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিকতার অভিযোগ তুলে ‘ট্রান্সফার অব প্রোপার্টি অ্যাক্ট, ১৮৮২’ সংশোধন বিলের বিরোধিতা করে জাতীয় সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেছেন বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যরা। একই সঙ্গে বিলটি জনমত যাচাইয়ের জন্য পাঠানোর দাবি জানালেও তা নাকচ করে সংসদে বিলটি পাস করা হয়েছে।
রোববার রাতে সংসদ অধিবেশনে বিলটি নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা ও বিতর্ক হয়। বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান বিলটি এ অধিবেশনে পাস না করে ইসলামী আইন ও ফিকহ বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়ার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, বাবা-মায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উদ্দেশ্য নিয়ে আইনটি করা হলে সেই উদ্দেশ্য নিয়ে তার আপত্তি নেই। তবে কুরআনে নির্ধারিত উত্তরাধিকার বিধানের সঙ্গে নতুন আইনের কোনো সাংঘর্ষিকতা তৈরি হচ্ছে কি না, তা গভীরভাবে পরীক্ষা করা প্রয়োজন। এ ধরনের বিষয়ে তাড়াহুড়ো করলে মানুষের ঈমান-আকিদা ও উত্তরাধিকার অধিকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জটিলতা তৈরি হতে পারে।
ডা. শফিকুর রহমান কুরআনের সূরা নিসার ১১, ১২, ১৩ ও ১৪ নম্বর আয়াতের প্রসঙ্গ তুলে ধরে বলেন, উত্তরাধিকার ও অসিয়তের বিষয়ে ইসলামে সুস্পষ্ট নীতিমালা রয়েছে। প্রস্তাবিত আইনের সঙ্গে এসব বিধানের সামঞ্জস্য যাচাই করা প্রয়োজন। এজন্য তিনি ইসলামিক ফাউন্ডেশনসহ সংশ্লিষ্ট শরিয়াহ বিশেষজ্ঞদের কাছে বিষয়টি পাঠানোর আহ্বান জানান।
বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমানও বিলটির বিরোধিতা করেন। তিনি দাবি করেন, কুরআন-সুন্নাহবিরোধী কোনো আইন না করার বিষয়ে আগে দেওয়া রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বর্তমান উদ্যোগের অসামঞ্জস্য রয়েছে। তার মতে, সম্পত্তির মালিকানা ও ভোগদখলের বিষয়কে কেন্দ্র করে এমন ব্যবস্থা তৈরি করা উচিত নয়, যার মাধ্যমে ইসলামী উত্তরাধিকার বিধান পাশ কাটানোর সুযোগ সৃষ্টি হয়।
অন্যদিকে কয়েকজন সংসদ সদস্য বিলটির মানবিক দিকের প্রতি সমর্থন জানিয়ে বাবা-মায়ের শেষ জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন। তারা সন্তানদের হাতে বাবা-মায়ের নিগৃহীত হওয়া এবং সম্পত্তি লিখে নেওয়ার পর তাদের অবহেলার ঘটনা বন্ধে কার্যকর আইন করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। একই সঙ্গে দাতা যাতে প্রয়োজন হলে দলিল বাতিলের সুযোগ পান এবং সম্পত্তি তৃতীয় পক্ষের কাছে হস্তান্তর বা বন্ধক দেওয়ার ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ থাকে—এমন সংশোধনের প্রস্তাবও দেওয়া হয়।
তবে বিলটির বিরোধিতা করে কয়েকজন সংসদ সদস্য বলেন, কতিপয় সন্তানের অপরাধের কারণে ইসলামী উত্তরাধিকার কাঠামো পরিবর্তন করা সমীচীন নয়। তাদের মতে, বাবা-মায়ের ভরণপোষণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিদ্যমান আইন কার্যকর করার পাশাপাশি প্রয়োজন হলে নতুন সুরক্ষা ব্যবস্থা করা যেতে পারে। কিন্তু কুরআন-সুন্নাহভিত্তিক পারিবারিক বিধানের সঙ্গে কোনো বিরোধ তৈরি হয় কি না, তা আগে যাচাই করা দরকার।
আলোচনায় ইসলামী ফিকহ অনুযায়ী হেবা, অসিয়ত ও উত্তরাধিকার বিধানের বিষয়ও উঠে আসে। কয়েকজন সংসদ সদস্য বলেন, সম্পত্তির মালিকানা হস্তান্তর ও বাস্তব দখল সংক্রান্ত বিধানের মধ্যে পার্থক্য তৈরি হলে ভবিষ্যতে উত্তরাধিকারীদের অধিকার ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এজন্য বিলটি জনমত যাচাই এবং আলেম-ওলামা ও ফিকহ বিশেষজ্ঞদের মতামতের জন্য পাঠানোর দাবি জানান তারা।
জবাবে আইনমন্ত্রী মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান বলেন, বিলটির সঙ্গে শরিয়া আইনের কোনো সংঘাত নেই। তিনি বিভিন্ন সময়ের আদালতের রায়ের উল্লেখ করে বলেন, সম্পত্তির মালিকানা এবং ভোগদখলের অধিকার পৃথকভাবে থাকার স্বীকৃতি ইসলামী আইনেও রয়েছে। তার দাবি, বাবা-মা সন্তানের নামে সম্পত্তির মালিকানা হস্তান্তর করলেও নির্দিষ্ট শর্তে তারা জীবদ্দশায় ওই সম্পত্তি ভোগদখল করতে পারবেন।
আইনমন্ত্রী আরও বলেন, মুসলিম বিশ্বের কয়েকটি দেশেও এ ধরনের বিধানের উদাহরণ রয়েছে। অসহায় বাবা-মাকে শেষ বয়সে নিরাপত্তাহীনতা থেকে রক্ষা করাই বিলটির মূল উদ্দেশ্য। এর পেছনে কোনো অসৎ উদ্দেশ্য নেই বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
পরে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে বিলটি জনমত যাচাইয়ের জন্য পাঠানোর প্রস্তাব দেওয়া হলে তা কণ্ঠভোটে নাকচ হয়ে যায়। এরপর ‘ট্রান্সফার অব প্রোপার্টি অ্যাক্ট, ১৮৮২’ সংশোধন বিলটি কণ্ঠভোটে পাস হয়। প্রতিবাদে রাত ৮টা ১০ মিনিটের দিকে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানসহ বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যরা সংসদ অধিবেশন থেকে ওয়াকআউট করেন।


