গণ দিগন্ত ডেস্ক:
তীব্র জ্বালানি সংকটের মধ্যে বাংলাদেশে বেড়েছে লোডশেডিং। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় ভোগান্তিতে পড়ছেন সাধারণ মানুষ। চাহিদার তুলনায় বিদ্যুৎ সরবরাহ কম থাকায় পরিস্থিতি কবে স্বাভাবিক হবে, সে বিষয়ে এখনো সরকারের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট আশার বার্তা পাওয়া যায়নি। এমন বাস্তবতায় বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিশেষ করে সৌরবিদ্যুতের ওপর গুরুত্ব বাড়াচ্ছে সরকার।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) তথ্য অনুযায়ী, চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় বর্তমানে দেশজুড়ে নিয়মিত কমবেশি ২ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট লোডশেডিং দিতে হচ্ছে। চলতি বছর একপর্যায়ে লোডশেডিং অতীতের রেকর্ড ছাড়িয়ে ৩ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াটে পৌঁছেছিল।

গত ১০ জুলাই দুপুরে দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ২৬২ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে সরবরাহ করা হয় ১২ হাজার ৫০৫ মেগাওয়াট। ফলে চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়।

এমন পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ উৎপাদনে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে। বিশেষ করে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছে বর্তমান সরকার।

সম্প্রতি বিদ্যুৎমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু জানিয়েছেন, বর্তমান সরকারের মেয়াদে দেশে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা ১০ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।

স্থানীয় পর্যায়ে সেবা ও বিনিয়োগকারী খোঁজা

এই লক্ষ্য বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে স্থানীয় পর্যায়ে এলাকাভিত্তিক সেবাদাতা ও বিনিয়োগকারীদের তালিকা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে দেশের বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাগুলো বিজ্ঞপ্তিও প্রকাশ করেছে।

তালিকাভুক্ত সার্ভিস প্রোভাইডাররা স্থানীয় পর্যায়ে রুফটপ সোলারসহ বিভিন্ন নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রযুক্তি স্থাপনে কারিগরি সহায়তা, বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক প্যাকেজ, গ্রাহকসেবা এবং পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ সুবিধা দেওয়ার কথা রয়েছে।

এর ফলে বাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন স্থাপনার ছাদে সৌর প্যানেল স্থাপনের সুযোগ বাড়তে পারে। একই সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে প্রশিক্ষিত ও নিবন্ধিত সেবা প্রদানকারী থাকলে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার রক্ষণাবেক্ষণও সহজ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

তবে বাংলাদেশের মতো বর্ষাপ্রধান দেশে সৌরবিদ্যুতের এই বড় লক্ষ্য বাস্তবায়ন কতটা সহজ হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বছরের একটি বড় সময় আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকায় সূর্যের আলো থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে স্বাভাবিকভাবেই ওঠানামা হতে পারে। এর পাশাপাশি অতীতের অভিজ্ঞতাও খুব একটা স্বস্তিদায়ক নয়।

যে পাঁচটি বিষয় বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে

সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞদের আলোচনায় মূলত কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে—

১. আবহাওয়া ও সূর্যালোকের ওপর নির্ভরশীলতা:
বাংলাদেশে বর্ষাকালে দীর্ঘ সময় মেঘ ও বৃষ্টির কারণে সূর্যালোক কম পাওয়া যায়। ফলে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সবসময় একই মাত্রায় রাখা কঠিন।

২. নীতি ও বাস্তবায়নের স্বচ্ছতা:
বড় পরিসরে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য বাস্তবায়নে সুস্পষ্ট নীতি, কার্যকর পরিকল্পনা ও স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন। নীতিগত দুর্বলতা থাকলে বড় বিনিয়োগও প্রত্যাশিত ফল নাও দিতে পারে।

৩. বিনিয়োগ ও খরচ:
সৌর প্যানেল, ইনভার্টার, ব্যাটারি ও অন্যান্য সরঞ্জাম স্থাপনে প্রাথমিক বিনিয়োগ প্রয়োজন। গ্রাহক পর্যায়ে এই খরচ কতটা সহনীয় হবে এবং বিনিয়োগের সুফল কত দ্রুত পাওয়া যাবে—এটিও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

৪. স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণের সক্ষমতা:
অতীতে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনের পর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও কারিগরি সেবা না পাওয়ার অভিযোগ ছিল। ফলে কে স্থাপন করবে, কে সার্ভিস দেবে এবং দীর্ঘমেয়াদে কে রক্ষণাবেক্ষণ করবে—এসব বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি।

৫. গ্রিড ও ব্যবস্থাপনা সক্ষমতা:
বিপুল পরিমাণ সৌরবিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করতে হলে বিদ্যুৎ সঞ্চালন, বিতরণ ও ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা বাড়াতে হবে। উৎপাদিত বিদ্যুৎ চাহিদার সময় কীভাবে ব্যবহার ও প্রয়োজন হলে সংরক্ষণ করা হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

‘মানুষকে সুবিধা বোঝানো বেশি কার্যকর’

জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ মনে করছেন, শুধু পরিকল্পনা গ্রহণ বা চাপ প্রয়োগ করে রুফটপ সোলারের বিস্তার ঘটানো যাবে না। এর জন্য গ্রাহকদের কাছে সৌরবিদ্যুতের সুবিধা স্পষ্ট করা এবং নির্ভরযোগ্য সেবা নিশ্চিত করা জরুরি।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ মো. মুজ্জাম্মেল হক মনে করেন, রুফটপ সোলারের সব ধরনের সেবা নিশ্চিত করা এবং এর সুবিধা মানুষকে বোঝানো বেশি কার্যকর হতে পারে।

তার মতে, আগে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের পর কে সেটি ইনস্টল করবে এবং পরবর্তী সময়ে কে সেবা দেবে—এ বিষয়গুলো অনেক ক্ষেত্রে পরিষ্কার ছিল না। অতীতে স্থাপনের পর যথাযথভাবে কাজ না করার ঘটনাও রয়েছে।

তিনি বলেন, স্থানীয় পর্যায়ে নিবন্ধিত সার্ভিস প্রোভাইডার পাওয়া গেলে মানুষ নিজ উদ্যোগেই জাতীয় গ্রিডের পাশাপাশি সৌরবিদ্যুতের দিকে যেতে আগ্রহী হবে।

বিদ্যুৎ সংকটে সৌরবিদ্যুৎ কতটা সমাধান দেবে?

দেশের বর্তমান বিদ্যুৎ সংকটের বাস্তবতায় সৌরবিদ্যুতের সম্ভাবনা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়ালেই সংকটের স্থায়ী সমাধান হবে না। এর পাশাপাশি বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও বিতরণব্যবস্থা শক্তিশালী করা, বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি, মানসম্মত যন্ত্রপাতি নিশ্চিত করা এবং দক্ষ রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।

সরকারের ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ সক্ষমতা অর্জনের লক্ষ্য বাস্তবায়িত হলে দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে। তবে সেই লক্ষ্য বাস্তবে রূপ দিতে হলে নীতি, অর্থায়ন, প্রযুক্তি, সেবা ও ব্যবস্থাপনার বিষয়গুলো সমন্বিতভাবে মোকাবিলা করাই হবে বড় পরীক্ষা।