হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের পরও চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা কেন কাটছে না?
গণ দিগন্ত ডেস্ক:
চট্টগ্রাম নগরের জলাবদ্ধতা নিরসনে গত প্রায় এক দশকে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় হলেও ভারী বৃষ্টি হলেই নগরের বিভিন্ন এলাকা পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে। খাল পুনঃখনন, সম্প্রসারণ, ড্রেন নির্মাণ, রিটেইনিং ওয়াল, স্লুইসগেট ও টাইডাল রেগুলেটরসহ নানা অবকাঠামো নির্মাণে চারটি বড় প্রকল্পে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১৪ হাজার ৩৮৯ কোটি টাকার বেশি। এর মধ্যে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে প্রায় ১০ হাজার ৪০৮ কোটি টাকা। এরপরও প্রবর্তক মোড়, চকবাজার, আগ্রাবাদ, কাতালগঞ্জ, মুরাদপুর, জিইসি, বহদ্দারহাট ও হালিশহরসহ বিভিন্ন এলাকায় বৃষ্টির সময় জলাবদ্ধতা দেখা দিচ্ছে।
সবচেয়ে বড় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)। ২০১৭ সালে শুরু হওয়া এ প্রকল্পের প্রাথমিক ব্যয় ছিল ৫ হাজার ৬১৬ কোটি টাকা, যা সংশোধনের পর বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ৬২৬ কোটি টাকায়। প্রকল্পের আওতায় ৩৬টি খাল পুনঃখনন, সম্প্রসারণ ও উন্নয়নের পাশাপাশি সড়ক, সেতু, কালভার্ট, টাইডাল রেগুলেটর, সিল্ট ট্র্যাপ ও বন্যা সংরক্ষণ জলাধার নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত অধিকাংশ খালের কাজ শেষ হলেও ভারী বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা অব্যাহত থাকায় প্রকল্পের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু খাল খনন বা ড্রেন নির্মাণ করলেই জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। নগরের বৃষ্টির পানি কোন পথে খালে যাবে, খাল থেকে কীভাবে কর্ণফুলী নদীতে পৌঁছাবে এবং জোয়ারের সময় নদীর পানির উচ্চতা কীভাবে মোকাবিলা করা হবে—এসব বিষয়কে সমন্বিতভাবে বিবেচনায় নিতে হবে। পাশাপাশি খালে পলি জমা, বর্জ্য ফেলা, দখল, জলাধার ভরাট এবং বিভিন্ন স্থানে পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ার কারণেও জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের এক সমীক্ষায় নগরের খালগুলোর তলদেশে ব্যাপক পলি জমার বিষয়টি উঠে এসেছে। এতে পানি নিষ্কাশনের সক্ষমতা কমে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে। ফলে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে খাল খননের পর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ না হলে অল্প সময়ের মধ্যেই খালের ধারণক্ষমতা আবার কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে নগরের ৫৭টি খালের মধ্যে বড় প্রকল্পের আওতায় থাকা ৩৬টি খালের বাইরে থাকা আরও ২১টি খাল নিয়েও নতুন করে প্রকল্পের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
জলাবদ্ধতার আরেকটি বড় কারণ হিসেবে বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয় ঘাটতি, খাল দখল, অননুমোদিত জলাধার ভরাট, ক্রস-কালভার্ট বন্ধ থাকা এবং নির্মাণসামগ্রী ও বর্জ্য ফেলার বিষয়গুলো উঠে এসেছে। চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা তাই শুধু ড্রেন বা খালের সমস্যা নয়; এর সঙ্গে নগর পরিকল্পনা, রক্ষণাবেক্ষণ, দখল ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং জোয়ার-ভাটার বিষয়ও জড়িত।
নগরবাসীর প্রশ্ন, হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের পরও যদি কয়েক ঘণ্টার ভারী বৃষ্টিতে নগরের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়, তাহলে প্রকল্পগুলোর বাস্তব সুফল কতটা নিশ্চিত হয়েছে? সংশ্লিষ্টদের মতে, নতুন প্রকল্প গ্রহণের পাশাপাশি আগের প্রকল্পগুলোর কাজ ও ব্যয়ের কার্যকারিতা মূল্যায়ন, খাল ও জলাধার দখলমুক্ত করা, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করা জরুরি। তাহলেই চট্টগ্রামের দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা সমস্যা টেকসইভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব হতে পারে।


