ডেস্ক রিপোর্ট :
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, জাতির প্রয়োজনে একবার নয়, শতবারও মাঠে নামতে প্রস্তুত তারা। যতদিন আল্লাহ জীবন দেবেন এবং চলার শক্তি থাকবে, ততদিন দেশের জনগণের কল্যাণে কাজ করে যাবেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

সোমবার (১০ আগস্ট) গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার বোনারপাড়ার কাজী আজহার আলী উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে আয়োজিত এক জনসমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সরকারদলীয় সন্ত্রাসীদের হামলায় নিহত শিবির নেতা শহীদ সাইফুল্লাহ বারী ও জামায়াত কর্মী সালাউদ্দিন আহমেদের হত্যার বিচার এবং দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির প্রতিবাদে এ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।

এর আগে ডা. শফিকুর রহমান দুই শহীদের কবর জিয়ারত করেন এবং তাঁদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছর জুলুম-নির্যাতন সহ্য করলেও তারা জুলুমের রাজনীতিতে বিশ্বাস করেন না। তিনি প্রশ্ন রাখেন, নির্বাচনের পর সরকার পরিবর্তন হলেও যদি জনগণ আবারও বঞ্চিত ও নির্যাতিত হয়, তাহলে সেই পরিবর্তনের অর্থ কী?

তিনি বলেন, জনগণের ট্যাক্সের টাকায় দেশ পরিচালিত হয়। তাই জনগণের অধিকার থেকে কাউকে বঞ্চিত করার অধিকার কারও নেই। উত্তরাঞ্চলের জনগণের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করারও দাবি জানান তিনি।

‘আমরা হত্যার রাজনীতি চাই না’

দুই তরুণের হত্যাকাণ্ডের প্রসঙ্গে জামায়াত আমির বলেন, তাঁরা এলাকার শ্রেষ্ঠ সন্তান ছিলেন। তাঁদের পরিবারের সদস্যদের কষ্টের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আর কোনো মায়ের বুক খালি হোক কিংবা কোনো বাবাকে সন্তানের লাশ কাঁধে নিতে হোক—এটি তারা চান না।

তিনি বলেন, ক্ষমতার লোভ, দখলদারিত্ব ও চাঁদাবাজি সমাজকে অমানবিক করে তোলে। ২০২৪ সালের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সমাজের অনিয়ম ও দুর্নীতি দূর করার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। সেই প্রত্যাশা পূরণে দখলদারিত্ব, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

প্রশাসনকে নিরপেক্ষ থাকার আহ্বান

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি প্রসঙ্গে ডা. শফিকুর রহমান প্রশাসনের প্রতি কঠোর বার্তা দেন। অপরাধীদের নজরদারিতে রাখা হলে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে অসুবিধা কোথায়—এ প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, প্রশাসন কোনো দলের নয়; এটি গোটা জাতির সম্পদ।

তিনি বলেন, ক্ষমতা কারও জন্য চিরস্থায়ী নয়। তাই প্রশাসনকে দলীয় প্রভাবমুক্ত থেকে নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। জনগণ যেন আইন নিজের হাতে তুলে নিতে বাধ্য না হয়, সেদিকেও নজর দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

‘আর কোনো ফ্যাসিবাদ দেখতে চাই না’

দেশের অতীত রাজনৈতিক পরিস্থিতি তুলে ধরে জামায়াত আমির বলেন, বিভিন্ন সময়ে মানুষকে হত্যা, গুম, নির্যাতন ও মামলা দিয়ে হয়রানি করা হয়েছে। এসবের পুনরাবৃত্তি আর দেখতে চান না তারা।

তিনি বলেন, ফ্যাসিবাদকে বাংলাদেশের জনগণ পরাজিত করেছে। দেশে আর কোনো স্বৈরাচারকে প্রশ্রয় দেওয়া হবে না। একই সঙ্গে তিনি এমন একটি বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন, যেখানে শিশু, নারী, যুবক, প্রবীণসহ সব শ্রেণি-পেশা ও ধর্ম-বর্ণের মানুষ নিরাপদে বসবাস করতে পারবেন।

দুর্নীতি-চাঁদাবাজি বন্ধের দাবি

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ রাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্ষেত্রে দলীয় নিয়ন্ত্রণ ও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ তুলে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, শিক্ষক নিয়োগে অর্থ লেনদেন, প্রতিষ্ঠান দখল এবং সাধারণ মানুষের কাছ থেকে বিভিন্নভাবে অর্থ আদায়ের সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে।

তিনি বলেন, তারা দুর্নীতি, দখলদারিত্ব ও চাঁদাবাজিমুক্ত একটি মানবিক বাংলাদেশ চান।

‘গণভোটের রায়কে সম্মান করতে হবে’

গণভোটের রায়কে সম্মান করার আহ্বান জানিয়ে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জনগণের মতামতকে উপেক্ষা করে কোনো রাজনৈতিক শক্তি দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারেনি। প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়ন করে গণতান্ত্রিক ও মানবিক বাংলাদেশের পথ উন্মুক্ত করার আহ্বান জানান তিনি।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের ওপর কোনো বিদেশি শক্তির খবরদারি তারা মেনে নেবেন না। দেশের মানুষ মাথা উঁচু করে বাঁচতে চায় এবং কোনো শক্তির কাছে গোলামি করতে চায় না।

দ্রুত বিচার ও গ্রেপ্তারের দাবি

সমাবেশে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে মাওলানা আবদুল হালিম শহীদ সাইফুল্লাহ বারী ও সালাউদ্দিন আহমেদের হত্যার দ্রুত বিচার দাবি করেন। তিনি অভিযোগ করেন, মামলায় অভিযুক্তদের মধ্যে এখনো কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়নি।

তিনি প্রশাসনের প্রতি অভিযুক্তদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার আহ্বান জানান এবং বলেন, আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ করতে হবে।

শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস বন্ধ করে শিক্ষার্থীদের নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করারও দাবি জানান তিনি।

সমাবেশে গাইবান্ধা-৫ আসনের সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল ওয়ারেছের সভাপতিত্বে জামায়াতের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতারা বক্তব্য দেন। এ সময় শহীদ সাইফুল্লাহ বারী ও শহীদ সালাউদ্দিন আহমেদের পরিবারের সদস্যরাও উপস্থিত ছিলেন।