চা বানানোর সময় হাত থেকে অসাবধানে পড়ে যায় কয়েক দানা চিনি। পায়েস বানাতে গিয়েও মাঝেমধ্যে দুধ উথলে পড়ে চুলার ওপর বা আশেপাশে। আর মিষ্টি খেতে গিয়ে তার গুঁড়ো তো হরহামেশাই গিয়ে পড়ে টেবিলের নিচে। এসব নিয়ে আমরা কেউই তেমন মাথা ঘামাই না।

কিন্তু এর ঠিক কিছুক্ষণ পরেই ঘটে এক আশ্চর্য দৃশ্য— দরজার প্রান্ত থেকে কিংবা ঘরের স্যাঁতস্যাঁতে কোনো কোণা থেকে হঠাৎ বেরিয়ে আসে পিঁপড়ের দল। আশ্চর্যের বিষয় হলো, তারা ঠিক সেই জায়গাতেই গিয়ে হাজির হয়, যেখানে পড়ে আছে মিষ্টি জাতীয় কিছু। এরপর সারি বেঁধে একের পর এক পিঁপড়ে এগিয়ে যেতে থাকে সেই খাবার কণার দিকে।

প্রশ্ন জাগে— এত নিখুঁতভাবে মাপঝোপ করে ঠিক ‘অকুস্থলে’ পৌঁছায় কীভাবে এই ক্ষুদ্র প্রাণীরা?

উত্তরটি লুকিয়ে আছে তাদের শরীরের এক বিশেষ অঙ্গে— অ্যান্টেনা বা শুঁড়ে। এই শুঁড় দিয়েই পিঁপড়েরা ঘরের মেঝে আক্ষরিক অর্থে “অনুভব” করতে পারে। এর মাধ্যমে তারা এমন সব সূক্ষ্ম ঘ্রাণ ও রাসায়নিক সংকেত শনাক্ত করতে সক্ষম হয়, যা মানুষের ঘ্রাণশক্তির নাগালের বাইরে। আর ঠিক এই অসাধারণ ক্ষমতার জোরেই মেঝেতে পড়ে থাকা খাবারের সামান্যতম কণাও তারা খুঁজে বের করে ফেলে নির্ভুলভাবে।

**পথের হদিস দেয় যে রাসায়নিক**

একটি পিঁপড়ে যখন প্রথমবার কোনো খাবারের সন্ধান পায়, তখন সে একা ফিরে আসে না বাসায়— ফেরার পথে নিজের শরীর থেকে এক বিশেষ ধরনের রাসায়নিক নিঃসরণ করতে করতে চলে, যাকে বলা হয় ফেরোমোন। এই অদৃশ্য রাসায়নিক রেখাই মূলত একটি “গন্ধের মানচিত্র” তৈরি করে, যা অনুসরণ করে বাকি পিঁপড়েরাও একই পথ ধরে খাবারের উৎসে পৌঁছে যায়। এ কারণেই একটি পিঁপড়ে খাবার খুঁজে পাওয়ার পর দেখা যায়, অল্প সময়ের মধ্যেই একটি নিখুঁত সারিবদ্ধ মিছিল তৈরি হয়ে গেছে— প্রতিটি পিঁপড়ে যেন কেউ একজন পথ দেখিয়ে দিয়েছে তাদের।

আকর্ষণীয় বিষয় হলো, যত বেশি পিঁপড়ে একটি নির্দিষ্ট পথ দিয়ে যাতায়াত করে, সেই পথের ফেরোমোনের ঘনত্বও তত বাড়তে থাকে— ফলে আরও বেশি পিঁপড়ে সেই পথেই আকৃষ্ট হয়। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় “পজিটিভ ফিডব্যাক লুপ”। খাবার ফুরিয়ে গেলে বা পথে কোনো পিঁপড়ে যাতায়াত বন্ধ করে দিলে ফেরোমোনের ঘ্রাণও ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায়, আর পিঁপড়ের সারিও আপনাআপনি ভেঙে যায়।

**দলবদ্ধ বুদ্ধিমত্তার এক বিস্ময়**

পিঁপড়ের এই আচরণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করে আসছেন কীটতত্ত্ববিদরা। এদের প্রতিটি সদস্যের বুদ্ধিমত্তা সীমিত হলেও, দলগতভাবে তারা যে জটিল ও কার্যকর সিদ্ধান্ত নিতে পারে, তা বিজ্ঞানীদের কাছে “সোয়ার্ম ইন্টেলিজেন্স” বা ঝাঁক-বুদ্ধিমত্তার একটি ধ্রুপদী উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত। এই একই নীতি অনুসরণ করে বিজ্ঞানীরা এখন রোবোটিক্স ও নেটওয়ার্ক রাউটিংয়ের মতো আধুনিক প্রযুক্তিতেও পিঁপড়ের এই আচরণ থেকে অনুপ্রেরণা নিচ্ছেন।

তাই পরের বার যখন হঠাৎ রান্নাঘরের কোণা থেকে পিঁপড়ের সারি বেরিয়ে আসতে দেখবেন, বুঝে নেবেন— এটি নিছক কাকতালীয় কিছু নয়, বরং লক্ষ লক্ষ বছরের বিবর্তনে তৈরি হওয়া এক নিখুঁত রাসায়নিক যোগাযোগ ব্যবস্থার ফল।