গণ দিগন্ত ডেস্ক

রাতে ঘুমানোর সময় সঙ্গীর নাক ডাকার শব্দকে অনেকেই সাধারণ বিরক্তি হিসেবে বিবেচনা করেন। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে এই শব্দের কারণে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটলে তা শুধু রাতের বিশ্রামেই নয়, বরং মনোযোগ, স্মৃতিশক্তি, মানসিক প্রশান্তি ও দাম্পত্য সম্পর্কেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে জানিয়েছেন ঘুম বিশেষজ্ঞরা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘুমের মধ্যে শ্বাসনালির নরম টিস্যুতে কম্পনের ফলে নাক ডাকার শব্দ সৃষ্টি হয়। বিষয়টি অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ হলেও কখনো কখনো এটি স্লিপ অ্যাপনিয়ার মতো গুরুতর শ্বাসপ্রশ্বাসজনিত সমস্যার লক্ষণ হতে পারে।

যুক্তরাজ্যের ব্রিটিশ স্নোরিং অ্যান্ড স্লিপ অ্যাপনিয়া অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশটির প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠীর প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ নাক ডাকেন। নারীদের তুলনায় পুরুষদের মধ্যে এ প্রবণতা বেশি দেখা যায়। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের স্লিপ ফাউন্ডেশনের এক জরিপে দেখা গেছে, যাদের জীবনসঙ্গী নাক ডাকেন, তাদের প্রায় ৭৫ শতাংশের ঘুম কোনো না কোনোভাবে ব্যাহত হয়।

মনোযোগ ও স্মৃতিশক্তিতে প্রভাব

ঘুমের সময় মস্তিষ্ক দিনের বিভিন্ন তথ্য প্রক্রিয়াজাত ও সংরক্ষণ করে। পাশাপাশি শরীরের পুনরুদ্ধারেও গভীর ঘুম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু সঙ্গীর নাক ডাকার কারণে বারবার ঘুম ভেঙে গেলে ঘুমের স্বাভাবিক ধারাবাহিকতা নষ্ট হয়।

ফলে পর্যাপ্ত সময় বিছানায় কাটানোর পরও সকালে ক্লান্তি, ঝিমুনি, মনোযোগের ঘাটতি ও স্মৃতিশক্তি দুর্বল হওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।

ঘুম বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আমা জোহালের মতে, নাক ডাকার কারণে সঙ্গীর ঘুম বারবার ব্যাহত হলে একপর্যায়ে তাকে আলাদা ঘরে গিয়ে ঘুমানোর সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে। কারণ, পর্যাপ্ত ঘুম ছাড়া দৈনন্দিন কাজকর্মে স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।

মানসিক চাপ ও দাম্পত্য সম্পর্কে প্রভাব

দীর্ঘদিন ঘুমের ঘাটতি থাকলে মানুষের মেজাজ, আবেগ নিয়ন্ত্রণ ও মানসিক চাপ সামলানোর ক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এতে খিটখিটে মেজাজ, অস্থিরতা এবং পারিবারিক বা দাম্পত্য জীবনে বিরোধ বাড়ার আশঙ্কা থাকে।

নাক ডাকার কারণে নিয়মিত ঘুমের ব্যাঘাত ঘটলে অনেক দম্পতির মধ্যে বিরক্তি তৈরি হয়। কেউ কেউ বাধ্য হয়ে আলাদা ঘরে ঘুমান, যা তাদের পারস্পরিক ঘনিষ্ঠতা ও সম্পর্কের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।

এ বিষয়ে অভিজ্ঞতা তুলে ধরে যুক্তরাজ্যের ২৯ বছর বয়সী মেগ ওয়ারেন জানান, সাবেক সঙ্গীর নাক ডাকার কারণে রাতে বারবার তার ঘুম ভেঙে যেত। সকালে ঘুম থেকে উঠে তার ঝিমঝিম ও দিশেহারা লাগত। এমনকি বিষয়টি তাদের সম্পর্কেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল।

কখন চিকিৎসকের পরামর্শ জরুরি?

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নাক ডাকাকে শুধু শব্দের সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক নয়। এর পেছনে স্লিপ অ্যাপনিয়া রয়েছে কি না, তা যাচাই করা জরুরি।

স্লিপ অ্যাপনিয়া এমন একটি শারীরিক অবস্থা, যেখানে ঘুমের মধ্যে বারবার শ্বাসপ্রশ্বাস বন্ধ হয়ে আবার শুরু হয়। এর উল্লেখযোগ্য লক্ষণগুলো হলো—

– ঘুমের মধ্যে শ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়া;
– রাতে হঠাৎ হাঁসফাঁস করে জেগে ওঠা;
– ঘন ঘন ঘুম ভেঙে যাওয়া;
– সকালে মাথাব্যথা;
– দিনের বেলায় অতিরিক্ত ঘুমঘুম ভাব।

এসব লক্ষণ দেখা গেলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। প্রয়োজন অনুযায়ী ঘুমের পরীক্ষা এবং বিশেষজ্ঞের মূল্যায়নের মাধ্যমে চিকিৎসা নির্ধারণ করা হয়।

স্লিপ অ্যাপনিয়ার ক্ষেত্রে রোগীর অবস্থা অনুযায়ী সিপিএপি (CPAP) মেশিন ব্যবহার কিংবা বিশেষ ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতে পারে।

নাক ডাকা কমাতে যেসব অভ্যাস সহায়ক

সাধারণ নাক ডাকার ক্ষেত্রে জীবনযাপনে কিছু পরিবর্তন উপকার দিতে পারে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। এর মধ্যে রয়েছে অতিরিক্ত ওজন কমানো, ধূমপান বন্ধ করা, ঘুমানোর আগে অ্যালকোহল পরিহার এবং চিৎ হয়ে না শুয়ে কাত হয়ে ঘুমানোর অভ্যাস করা।

এ ছাড়া নাকের ভেতরে বাধা বা অ্যালার্জির কারণে নাক ডাকলে তার যথাযথ চিকিৎসা প্রয়োজন। কিছু রোগীর ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শে বিশেষভাবে তৈরি মাউথগার্ড ব্যবহারও উপকারী হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সঙ্গীর নাক ডাকার কারণে দীর্ঘদিন ধরে ঘুমের সমস্যা সহ্য না করে এর কারণ নির্ণয় করা উচিত। প্রয়োজনে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া এবং দুজনের ঘুমের পরিবেশ উন্নত করার উদ্যোগ নেওয়াই হতে পারে সুস্থ জীবনযাপনের গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।