ডেস্ক রিপোর্ট :
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি নিয়ে জামায়াতের জরুরি ব্রিফিং, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে হামলাকারীদের গ্রেপ্তারের দাবি

দেশে সরকারের প্রতি জনগণের ক্রমবর্ধমান অনাস্থা আড়াল করতে পরিকল্পিতভাবে দেশজুড়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য মিয়া গোলাম পরওয়ার।

সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় রাজধানীর মগবাজারে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দেশের অবনতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ ব্রিফিংয়ে তিনি এসব কথা বলেন।

মিয়া গোলাম পরওয়ার অভিযোগ করেন, সরকারের সাত মাসে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছে। এ পরিস্থিতিতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সুশীল সমাজ উদ্বেগ প্রকাশ করলেও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পক্ষ থেকে কার্যকর ভূমিকা দেখা যাচ্ছে না। ফলে জনগণের মধ্যে সরকারের প্রতি আস্থাহীনতা বাড়ছে।

তিনি বলেন, জুলাই সনদের আলোকে দলীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে একটি মানবিক ও নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যাশা ছিল জনগণের। কিন্তু ক্ষমতায় যাওয়ার পর বিএনপি বিভিন্ন পর্যায়ে দলীয় নিয়ন্ত্রণ ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। তার দাবি, মহানগর থেকে শুরু করে জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন ও গ্রাম পর্যায়ে দলীয় সিন্ডিকেট গড়ে ওঠায় সন্ত্রাস ও সংঘাত বাড়ছে।

গ্রামাঞ্চলের বিভিন্ন ঘটনা তুলে ধরে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, সার ডিলার নিয়োগ, ইমাম-খতিবদের ভাতা, কৃষক ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ, তালিকা প্রণয়ন ও তদারকিসহ বিভিন্ন বিষয়কে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে। এমনকি সার বিতরণ নিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়েও হামলার ঘটনা ঘটেছে। এতে দেশজুড়ে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তার অভিযোগ, ভেরিফিকেশনের নামে একশ্রেণির প্রার্থীকে নিয়োগ থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে এবং দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। এর প্রতিবাদে শাহবাগে নিয়োগবঞ্চিত শিক্ষিত নারী-পুরুষ অবস্থান নিয়ে নিজেদের দাবি জানাচ্ছেন।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্যদের মাধ্যমে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের উন্নয়ন কার্যক্রমে হস্তক্ষেপ করা হচ্ছে। নির্বাচিত এমপিদের ডিও লেটার বাতিল করে সংরক্ষিত নারী এমপিদের ডিও লেটারের ভিত্তিতে বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি।

মিরপুরের রাড্ডা মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা, ভাঙচুর ও মূল্যবান সামগ্রী লুটপাট এবং ইসিবি চত্বরে সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলার ঘটনা উল্লেখ করে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, এসব ঘটনায় সরকারদলীয় লোকজনের ইন্ধন রয়েছে বলে তারা মনে করেন। অপরাধীদের রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করতে হবে।

তিনি বলেন, অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে বিরোধী দলের ওপর দায় চাপানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। সরকারদলীয় নেতাকর্মী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের পৃষ্ঠপোষকতায় অপরাধীরা সুযোগ পাচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। অবিলম্বে সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার করে শাস্তির আওতায় আনার দাবি জানান জামায়াতের এই নেতা।

মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, রাজধানীতে মানুষের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা না থাকলে সারাদেশের সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়। দ্রব্যমূল্য, সার, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট নিরসনে সরকারের ব্যর্থতা এবং গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না করার কারণে জনগণের মধ্যে যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে, তা থেকে দৃষ্টি সরাতেই দেশজুড়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা হচ্ছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।

গণভোটের রায় ও জুলাই সনদ বাস্তবায়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জনগণের রায় কার্যকর না করে সরকার জাতিকে নতুন সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ঐকমত্য কমিশনের প্রস্তাবিত কাঠামো অনুসরণ না করে নিজেদের দলীয় এজেন্ডা বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, জনগণের গণরায় উপেক্ষা করে কোনো সরকার দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারেনি। দাবি আদায়ে সংসদের ভেতরে ও বাইরে জামায়াতের কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে। গণবিরোধী কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তার বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিবাদ গড়ে তোলা হবে।

### জামায়াতের পাঁচ দফা দাবি

সংবাদ ব্রিফিংয়ে মিয়া গোলাম পরওয়ার সরকারের কাছে পাঁচটি দাবি তুলে ধরেন। দাবিগুলো হলো—

১. রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলায় জড়িত দুর্বৃত্ত ও তাদের নেপথ্যের পৃষ্ঠপোষকদের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে চিহ্নিত করে গ্রেপ্তার এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা।

২. লুট হওয়া টিকা, টিকাদানের রেজিস্টার ও প্রয়োজনীয় নথিপত্র উদ্ধার করা, যাতে কোনো শিশুর টিকাদান কার্যক্রম ব্যাহত না হয়।

৩. স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে অবিলম্বে বিকল্প স্থানে টিকাদান কার্যক্রম চালু করা।

৪. ক্ষতিগ্রস্ত স্বাস্থ্যকেন্দ্র পুনর্নির্মাণ ও ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা এবং জমি দখলের যেকোনো অপচেষ্টা প্রতিহত করা।

৫. ঘটনার সময় স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা খতিয়ে দেখতে নিরপেক্ষ তদন্তের ব্যবস্থা করা।

ব্রিফিংয়ে উপস্থিত ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান এমপি, মাওলানা আবদুল হালিম, অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য অ্যাডভোকেট মতিউর রহমান আকন্দ, মোবারক হোসাইন, নুরুল ইসলাম বুলবুল এমপি, ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ এমপি ও ড. রেজাউল করিম, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য অ্যাডভোকেট ড. হেলাল উদ্দিন, কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ইয়াছিন আরাফাত ও আতাউর রহমান সরকারসহ কেন্দ্রীয় নেতারা।