রক্তাক্ত ২৮ অক্টোবর: দুই দশক পরেও অমীমাংসিত বিচারহীনতার কালো অধ্যায়
ডা. সিদ্দিকুর রহমান প্রামানিক
২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক কলঙ্কজনক অধ্যায়। সেদিন চারদলীয় জোট সরকারের মেয়াদ শেষের দিনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের লগি-বৈঠা, লোহার রড ও অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা ঢাকার পল্টন এলাকায় জামায়াতে ইসলামীর পূর্বনির্ধারিত জনসভায় হামলা চালায়। এই হামলায় ঢাকাসহ সারাদেশে জামায়াত ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মী এবং সাধারণ মানুষ মিলিয়ে নিহতের সংখ্যা বিভিন্ন সূত্রে ভিন্নভাবে উল্লেখ করা হয়েছে—জামায়াতের সাম্প্রতিক বিবৃতিতে ১৪ জন শহীদের কথা বলা হয়েছে, তবে ঘটনার তাৎক্ষণিক প্রতিবেদনে সারাদেশে ৫৪ জন নিহত এবং ৫ হাজারের বেশি আহতের দাবি করা হয়েছিল। এই সংখ্যাগত পার্থক্য নিজেই প্রমাণ করে যে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত আজও হয়নি।
ঘটনার দিনের বর্ণনা অনুযায়ী, ২৮ অক্টোবর সকাল ১১টা থেকেই লগি-বৈঠাধারীরা বিজয়নগর, তোপখানা রোড ও মুক্তাঙ্গন থেকে পল্টন মোড়ে হামলা শুরু করে। বিকেল ৪টা ৪৩ মিনিটে নির্মাণাধীন ভবনের ছাদ থেকে বোমা ও গুলি বর্ষণ করা হয়। জামায়াত কর্মী জসিম উদ্দিন ও হাবিবুর রহমান গুলিতে নিহত হন; শিবির নেতা মুজাহিদুল ইসলামকে পিটিয়ে হত্যা করা হয় এবং মৃতদেহের ওপর নৃত্য-উল্লাসের অভিযোগও ওঠে। সন্ধ্যায় বিডিআর পল্টন মোড়ে অবস্থান নিলে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হয়।
ঘটনার পর ২০০৬ সালের ২৯ অক্টোবর জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে পল্টন থানায় মামলা দায়ের করা হয়। ২০০৭ সালের ১১ এপ্রিল শেখ হাসিনাকে পলাতক আসামি করে ৪৬ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল হয়। কিন্তু ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর ৯ জুলাই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মামলাটি প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত জানায় এবং ১৭ আগস্ট আদালত তা মঞ্জুর করে। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, বাদীর সম্মতি ছাড়া হত্যা মামলা প্রত্যাহার আইনত অবৈধ; এই প্রত্যাহারের মধ্য দিয়েই বিচার পাওয়ার পথ রুদ্ধ হয়ে যায়।
নতুন প্রেক্ষাপট: ২০২৬ সালে এসে বিচারের দাবি নতুন মোড়ে
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ২৮ অক্টোবরের বিচারের দাবি নতুন করে শক্তিশালী হয়েছে। ২০২৬ সালের ২৫ ও ২৬ অক্টোবর বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বিবৃতি দিয়ে ২৮ অক্টোবরের হত্যাকাণ্ডের মামলা পুনরুজ্জীবিত করে জড়িতদের গ্রেফতার ও শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ৫ আগস্টের গণআন্দোলনের ফলে দেশ ফ্যাসিবাদমুক্ত হওয়ার পর ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি হয়েছে; তাই ২৮ অক্টোবরের মামলা পুনরায় সচল করতে হবে।
জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার ২৫ অক্টোবর এক বিবৃতিতে দুই দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেন: ২৭ অক্টোবর ঢাকা মহানগরীতে আলোচনা সভা এবং ২৮ অক্টোবর সারাদেশে বিক্ষোভ, আলোচনা সভা ও দোয়া। তিনি বলেন, “ঐতিহাসিক এ ঘটনার দুই দশক পূর্তি হতে যাচ্ছে। অথচ আজও হত্যাকারীদের বিচার হয়নি, যা অত্যন্ত দুঃখজনক ও লজ্জাজনক।”
বিশ্লেষণ: সংখ্যা বনাম সত্য
উল্লেখ্য, নিহতের সংখ্যা নিয়ে জামায়াতের সাম্প্রতিক বিবৃতিতে ১৪ জন এবং ২০২৬ সালের ২৮ অক্টোবরের বিশেষ সংখ্যায় ৫৪ জনের কথা বলা হয়েছে। এই অসঙ্গতি নিজেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলে: যদি ঘটনার মূল তথ্য-উপাত্তই বিভিন্ন সূত্রে ভিন্ন হয়, তাহলে সুষ্ঠু তদন্ত ছাড়া বিচার কীভাবে সম্ভব? ফৌজদারি অপরাধ তামাদি না হলেও দুই দশক পরেও মামলা প্রত্যাহৃত অবস্থায় থাকা এবং কোনো আসামির বিচার না হওয়া প্রমাণ করে রাষ্ট্রীয় مستوىে বিচারহীনতার সংস্কৃতি প্রশ্রয় পেয়েছে।
২৮ অক্টোবরের ঘটনা কেবল একটি দলের ক্ষতি নয়; এটি বাংলাদেশের গণতন্ত্রের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করেছে। লগি-বৈঠার রাজনীতি থেকে যে সহিংসতার সংস্কৃতি জন্ম নিয়েছে, তার ধারাবাহিকতায় পরবর্তী বছরগুলোতে আরও রাজনৈতিক সহিংসতা ও বিচারহীনতার ঘটনা ঘটেছে। ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের পর নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় ২৮ অক্টোবরের মামলা পুনরুজ্জীবিত করা গেলে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর দুই দশকের অপেক্ষার কিছুটা হলেও অবসান হতে পারে—এবং ভবিষ্যতে রাজপথে লগি-বৈঠা দিয়ে রাজনৈতিক বিরোধ নিষ্পত্তির সংস্কৃতি বন্ধ করার একটি দৃষ্টান্ত স্থাপিত হতে পারে।
প্রতিষ্ঠাতা ও প্রকাশক, গণ দিগন্ত

